Friday, May 1, 2026
Homeআন্তর্জাতিকহরমুজে ছড়িয়ে পড়া তেল দেখা যাচ্ছে মহাকাশ থেকেও, বিপন্ন পরিবেশ

হরমুজে ছড়িয়ে পড়া তেল দেখা যাচ্ছে মহাকাশ থেকেও, বিপন্ন পরিবেশ

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক হামলার জেরে পারস্য উপসাগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তেল দূষণ এখন মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে এটি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় তেল স্থাপনা ও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। এতে শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতিই নয়, পারস্য উপসাগরের নাজুক জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৭ এপ্রিল ধারণ করা একটি ছবিতে দেখা যায়, ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হরমুজ প্রণালির পাঁচ মাইলেরও বেশি এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস জার্মানির মুখপাত্র নিনা নোয়েলের বরাতে জানা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ‘শহিদ বাঘেরি’ নামের একটি ইরানি জাহাজ থেকেই ওই এলাকায় তেল নিঃসরণ ঘটে।

একই দিনে ধারণ করা আরেকটি ছবিতে লাভান দ্বীপের আশপাশে তেলের উপস্থিতি দেখা যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, দ্বীপসংলগ্ন একটি তেল স্থাপনায় ‘শত্রুপক্ষের’ হামলায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, যা সিএনএন যাচাই করেছে, তাতে একটি ইরানি তেল শোধনাগারে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যও দেখা যায়।

ডাচ শান্তি সংস্থা প্যাক্স-এর প্রকল্প প্রধান উইম জুইনেনবার্গ এই ঘটনাকে ‘বড় ধরনের পরিবেশগত জরুরি অবস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, লাভান দ্বীপের অন্তত পাঁচটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে দ্বীপসংলগ্ন সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা ধীরে ধীরে শিদভার দ্বীপের দিকেও ছড়িয়ে যাচ্ছে।

শিদভার দ্বীপ পারস্য উপসাগরের একটি সংরক্ষিত প্রবাল দ্বীপ, যেখানে কচ্ছপ, সামুদ্রিক পাখিসহ নানা সংরক্ষিত প্রাণীর আবাস। এই এলাকায় তেল পৌঁছালে সেখানকার বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে কুয়েত উপকূলের কাছেও ৬ এপ্রিল তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখা গেছে। ওই দিন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হাজারো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারী যারা মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। তেল দূষণে মাছ দূষিত হলে খাদ্য ও আয়ের উৎস দুই-ই সংকটে পড়বে।

এ ছাড়া, কচ্ছপ, ডলফিন ও তিমির মতো সামুদ্রিক প্রাণী তেল গিলে ফেলতে পারে বা তেলের স্তরে আটকে পড়তে পারে, যা তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলো। উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ১০ কোটি মানুষ এসব প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। তেল দূষণ এসব প্ল্যান্টের ফিল্টারিং ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা বিশুদ্ধ পানির সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

বর্তমানে এই দূষণের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উপসাগরে থাকা প্রায় ৭৫টি বড় তেলবাহী ট্যাংকার, যেগুলোতে প্রায় ১৯ বিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত তেল রয়েছে, এর যেকোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল দূষণের প্রভাব ব্যাপক—অণুজীব থেকে শুরু করে মাছ, পাখি এবং ম্যানগ্রোভনির্ভর সামুদ্রিক কচ্ছপ পর্যন্ত পুরো বাস্তুতন্ত্র এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই দূষণ পরিষ্কার করা। দুর্গম এলাকা, জটিল ভৌগোলিক কাঠামো এবং চলমান সংঘাতের কারণে পরিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ফলে পারস্য উপসাগর এখন শুধু সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রই নয়, ধীরে ধীরে একটি সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকেও এগিয়ে যাচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments