Wednesday, July 22, 2026
Homeনীতি সুদহার কী? ব্যাংক ঋণে এর প্রভাব পড়বে কীভাবে?

নীতি সুদহার কী? ব্যাংক ঋণে এর প্রভাব পড়বে কীভাবে?

দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরেই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রেপো রেট’ বা নীতি সুদহার বাড়িয়ে রাখছে। বর্তমানে এই হার ১০ শতাংশ।

প্রশ্ন হলো, রেপো রেট বা নীতি সুদহার কী? এটি বাড়ালে বা কমালে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ে? মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এই হার কীভাবে কাজ করে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে দেশের প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে সুদ হারে ঋণ নিতে হয়, সেটাই হলো ‘রিপারচেজ’ বা ‘রেপো’ রেট। একে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘নীতি সুদহার’ও বলা হয়।

অর্থনীতিতে রেপো রেটকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রানীতিগত অস্ত্র বলা হয়। কেননা, রেপো রেট বাড়লে ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি সুদ দিয়ে অর্থ নিতে হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়ে আমানত ও ঋণের সুদের হারের ওপর। বেশি সুদে নেওয়া টাকা ব্যাংকগুলো গ্রাহককেও বেশি সুদে বিতরণ করে। ফলে, গ্রাহকের মাঝে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে। বিপরীতে, রেপো রেট কম থাকলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে।

বাজারে অর্থের প্রবাহ বেশি থাকলে মানুষ বিনিয়োগ ও ভোগ বেশি করে থাকে। এতে করে পণ্যের চাহিদা বাড়ে এবং সেইসঙ্গে বেড়ে যায় পণ্যের দাম, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তোলে।

এই প্রক্রিয়ায় মূল্যস্ফীতি কমিয়ে রাখার চেষ্টার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো রেট বাড়িয়ে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

রেপো রেট দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তবে, এই হার বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমে যাবে কিংবা এই হার কমালেই মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে, বিষয়টি এত সরল নয়। মূল্যস্ফীতিতে রেপো রেট যে প্রভাব ফেলে তা হলো—

১. ব্যাংকঋণ ব্যয়বহুল হয়। এতে করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কম ঋণ নেয় এবং বাজারে তখন নগদ অর্থ কম থাকে।

২. বাজারে নগদ অর্থ কম থাকলে ক্রয়-বিক্রয় কমে যায় এবং নতুন অর্থ সৃষ্টির গতি কমে যায়। অর্থাৎ জনগণের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ কমে যায়।

৩. নগদ অর্থ কম থাকলে মানুষের ভোগ ও বিনিয়োগের চাহিদা কমে আসে এবং চাহিদা কমলে পণ্যের দামও কম থাকে।

তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি কেবল চাহিদা ও অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে হয় না। এর বড় অংশই সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বিনিময় হারের মতো কারণে হয়ে থাকে।
সেক্ষেত্রে কেবল রেপো রেট বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমানো বা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, বাংলাদেশে মূল্যম্ফীতি মূলত চাহিদা বৃদ্ধির কারণে হচ্ছে না।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, বিনিময় হার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বাজারের অদক্ষতা সবকিছুই মূল্যস্ফীতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। কাজেই শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে এসব সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব না।’

তার মতে, মুদ্রানীতির পাশাপাশি বিচক্ষণ রাজস্বনীতি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, সরবরাহ সংকট নিরসন ও বাজারে প্রতিযোগিতা জোরদারে বিস্তৃত কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নীতিগত সমন্বয় করা না হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানো কঠিন হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক দীন ইসলামও একই কথাই বলেন।

তার ভাষ্য, ‘মনে রাখতে হবে যে মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো সরবরাহজনিত সমস্যা, উচ্চ আমদানি ব্যয়, বিনিময় হারের প্রভাব এবং বাজারের অনমনীয়তা।’

তিনি বলেন, ‘মুদ্রানীতিতে শুধু সুদের হার নির্ধারণ করলেই হবে না; বরং নীতি বাস্তবায়নের কৌশলও স্পষ্ট করতে হবে—বাংলাদেশ ব্যাংক কীভাবে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণ করবে, ঋণ শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করবে, রাজস্বনীতির সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে।’

একদিকে রেপো রেট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করে, অন্যদিকে অর্থ প্রবাহ কমে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়ে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

রেপো রেট বৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের সুদ হার বেড়ে গেলে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে যায়। কারণ, ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে গেলে নতুন কারখানা স্থাপন, যন্ত্রপাতি আমদানি, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা নতুন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের খরচও বেড়ে যায়।

যেমন, কোনো ব্যবসায়ী ১০ শতাংশ সুদে ১০০ টাকা ধার নিলে বছর শেষে তাকে ১১০ টাকা ফেরত দিতে হবে। অর্থাৎ ওই ধার নেওয়া ১০০ টাকায় ১১৫ টাকার ব্যবসা করলে হাতে ৫ টাকা লাভ থাকে। কিন্তু ১৫ শতাংশ সুদ হলে তাকে ১০০ টাকায় ১২০ টাকার ব্যবসা করতে হবে। সেটা যেহেতু ক্রমশ কঠিন হয়ে যায়, তাই বেশি সুদে মানুষ ঋণও কম নেয়। ফলে এমন পরিস্থিতি হলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগ বন্ধ রাখে কিংবা বিনিয়োগের পরিসর ছোট করে ফেলে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা এর ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন। কারণ, তাদের নিজস্ব মূলধন তুলনামূলক কম হয় এবং ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা থাকে।

আর বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টিও হয় না এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ধীর হয়ে আসে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে কঠিন যে প্রশ্নটি থাকে তা হলো—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে নাকি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াবে?

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, রেপো রেট বৃদ্ধির ফলে স্বল্পমেয়াদে কিছু বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাগামহীন মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের জন্য আরও ক্ষতিকর। কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা চাহিদা অনিশ্চিত হয়ে যায়।

তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে সেগুলো হলো—

১. সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন করে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে। এতে করে কোনো পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়বে না।

২. উৎপাদনমুখী খাতে স্বল্পসুদের বিশেষ ঋণ দিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য।

৩. সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে।

৪. বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, আমদানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাসহ এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে এর কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল সুদ হার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টেকসই সমাধান পাওয়া সম্ভব না। শক্তিশালী আর্থিক খাত, কার্যকর রাজস্বনীতি, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা ও সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments