Thursday, July 23, 2026
Homeঅপরাধকাঙালিনী সুফিয়া: আবার কি তাকে পথে নামতে হবে?

কাঙালিনী সুফিয়া: আবার কি তাকে পথে নামতে হবে?

একসময় তার গান শুনতে মানুষ ভিড় করত। দেশের সীমানা পেরিয়ে লোকগানের সুর নিয়ে গেছেন বিদেশের মঞ্চেও। যে কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছিল লাখো মানুষ, সেই কণ্ঠ আজ প্রায় স্তব্ধ। বয়স, অসুস্থতা আর অর্থকষ্ট মিলিয়ে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন লোকসংগীতশিল্পী কাঙালিনী সুফিয়া।

কয়েক সপ্তাহ আগে বাথরুমে পড়ে তার একটি হাত ভেঙে যায়। তার আগেই বয়সজনিত নানা অসুস্থতায় নুয়ে পড়েছিলেন তিনি। এখন আর নিয়মিত গান গাইতে পারেন না, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াও সম্ভব হয় না। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে আয়ের প্রধান উৎস।

সংসারে ছয়জনের ভরণপোষণ, নিজের চিকিৎসা আর মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকার ওষুধ—সব মিলিয়ে দিনগুলো যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে।

অথচ এই মানুষটিই একসময় ছিলেন পথের জনপ্রিয় শিল্পী। ঢাকার ফুটপাত, মাজার কিংবা জনসমাগমের জায়গায় গান গেয়েই চলত তার জীবন।

১৯৮১ সালের এক সন্ধ্যায় ঢাকার হাইকোর্ট মাজার এলাকায় গান গাইছিলেন তিনি। সেই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক ও কবি ফজল-এ-খোদা। অচেনা এক নারীর কণ্ঠ তাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। মুহূর্তেই তিনি বুঝেছিলেন, এই কণ্ঠ পথের ধুলোয় পড়ে থাকার নয়।

ফজল-এ-খোদার উদ্যোগেই বাংলাদেশ বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ পান সুফিয়া। পরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফা মনোয়ার তার নামের আগে যুক্ত করেন ‘কাঙ্গালিনী’। সেই থেকে পথশিল্পী সুফিয়া খাতুন হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় ‘কাঙালিনী সুফিয়া’।

নিজের জীবনের সেই মোড় ঘুরে যাওয়ার সময়টির কথা এখনও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

‘আমি তখন পথে পথে গান গাইতাম। পথেই জীবন কাটত। কবি ফজল-এ-খোদা আমাকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তার কারণেই সবাই আমাকে চিনেছে’, বলেন তিনি।

এরপর তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে’, ‘আমার ভাটি গাঙের নাইয়া’, ‘মনে বাবলা পাতার কষ লেগেছে’, ‘আমার মাটির গাছে লাউ ধইরাছে’, ‘বন্ধু চেনা দায়’ কিংবা ‘ওকি ময়নারে’—এমন অসংখ্য গান তাকে পৌঁছে দেয় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লোকশিল্পীর আসনে।

১৯৬১ সালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জন্ম তার। জন্মনাম টুনি হালদার। কৈশোরেই গানকে বেছে নেন জীবনের পথ হিসেবে। পরে ওস্তাদ হালিম বয়াতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুফিয়া খাতুন নাম ধারণ করেন।

পাঁচ শতাধিক গান রচনা করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন, অভিনয়ও করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের লোকসংগীতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। গানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অন্তত ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।

কিন্তু শিল্পীর জীবনের শেষ অধ্যায়ের গল্পটি অন্যরকম বেদনার।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার কল্যাণপুর বিলপাড়া গ্রামে সরকারিভাবে নির্মিত হয়েছে তার বসতঘর ও ‘সুফিয়া একাডেমি’। ৪ জুলাই সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসার জন্য তিনি ঢাকায় অবস্থান করায় বাড়িতে নেই। তবে প্রতিবেশীদের বর্ণনায় উঠে আসে তার বর্তমান জীবনের করুণ উপাখ্যান।

প্রতিবেশী বিবি হাওয়া বলেন, ‘তিনি আমাকে খালা বলে ডাকেন। সংসারে টানাপোড়েনের কারণে অনেক সময় আমার বাড়িতে এসে খাবার খান। এত বড় একজন শিল্পীর এমন কষ্ট দেখতে খুবই খারাপ লাগে।’

স্থানীয় মুদি ব্যবসায়ী মুরাদ ব্যাপারী বলেন, ‘তার কারণে আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ এসেছে, পাকা রাস্তা হয়েছে, দেশের নানা জায়গা থেকে মানুষ আসে। কিন্তু যার জন্য এত কিছু, তিনি নিজেই এখন ভালো নেই।’

প্রতিবেশী আলমগীর পাটোয়ারী জানান, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন মাঝেমধ্যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও তার চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ এত বেশি যে সেই সহায়তাও অপ্রতুল।

আরেক প্রতিবেশী মো. ইব্রাহিমের ভাষায়, ‘কাঙালিনী সুফিয়া নামটি যেন এখন তার জীবনের বাস্তবতার সঙ্গেই মিলে গেছে। এত সম্মান আর পুরস্কারের পরও জীবনের শেষ সময়ে এমন কষ্ট সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না।’

মুঠোফোনে কথা হয় শিল্পীর মেয়ে পুষ্পর সঙ্গে। তিনি জানান, তার মায়ের ওষুধের পেছনেই প্রতি মাসে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এখন আর আগের মতো অনুষ্ঠান করতে পারেন না বলে সেই অর্থ জোগাড় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পুষ্প বলেন, ‘চিকিৎসকেরা মাকে কোনো ধরনের মানসিক চাপ নিতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু সংসারের বাস্তবতা তো চাপ কমায় না।’

তিনি জানান, আগে শিল্পীর সম্মানী হিসেবে সরকার থেকে বছরে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পেতেন তার মা। বর্তমানে সেই ভাতা কমে বছরে ১২ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। এ ছাড়া, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল থেকে মাসে ১০ হাজার টাকা পান। এই অর্থ দিয়ে সংসার চালানো এবং চিকিৎসার ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।

রাজবাড়ী উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক এজাজ আহমদ বলেন, ‘কাঙালিনী সুফিয়া আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। যে শিল্পী পথ থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের লোকসংগীতকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছেন, তার জীবনের এই পরিণতি আমাদের সবার জন্যই বেদনাদায়ক।’

কাঙালিনী সুফিয়ার জীবন যেন এক অপূর্ণ বৃত্তে ঘেরা। জীবনের শুরু হয়েছিল পথে পথে গান গেয়ে। সেই পথ থেকে উঠে এসে তিনি হয়েছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লোকশিল্পী।

কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে আবারও প্রশ্নটি ফিরে আসে—যে শিল্পী একসময় পথের গান দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, বেঁচে থাকার তাগিদে আবার কি তাকে পথেই নামতে হবে?

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments