Friday, July 24, 2026
Homeমাঠে ‘স্পেস জ্যাকেটে’ যেভাবে ঠান্ডা থাকছেন ফুটবলাররা

মাঠে ‘স্পেস জ্যাকেটে’ যেভাবে ঠান্ডা থাকছেন ফুটবলাররা

ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটির কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। ১১ জুন মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের শুরুতে জাতীয় সংগীত গাইতে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলাররা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন রুপালি রঙের ঢিলেঢালা এক জ্যাকেট পরে।

অনেকের কাছেই বিষয়টি অদ্ভুত লেগেছিল—এত গরমে আবার অতিরিক্ত পোশাক কেন?

আবার অনেকের কাছে রূপালি জ্যাকেট পরা খেলোয়াড়দের মহাকাশচারীদের মতো মনে হচ্ছিল।

এই রূপালি রঙের জ্যাকেট আসলে কী এবং কেন পরেছেন খেলোয়াড়রা—সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিকের প্রতিবেদনে উঠে আসে এর পেছনের বিজ্ঞান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৪ সালের পর এটিই ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বইছে তীব্র তাপপ্রবাহ। গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৭৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখেছে নিউইয়র্কবাসী। এমন পরিস্থিতিতে চলমান বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অংশ নেওয়া দলগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—শরীর ঠান্ডা রাখা।

আর এ জন্যই রূপালি রঙের এই বিশেষ জ্যাকেট তৈরি করেছে বিশ্বের শীর্ষ ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। তাদের ‘ক্লাইমাকুল’ প্রযুক্তির অংশ এই জ্যাকেট, যা খেলোয়াড়দের ত্বক ও শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

এই কুলিং ব্যবস্থায় বিশেষ জ্যাকেট ছাড়াও রয়েছে কুলিং ভেস্ট এবং জুতার ওপর পরার জন্য শীতলকারী আবরণ বা ওভারশু।

অ্যাডিডাসের ইনোভেশন অ্যাথলেট পারফরম্যান্স বিভাগের গ্লোবাল ডিরেক্টর মার্গেরিতা রাককুলিয়া দ্য অ্যাথলেটিককে বলেন, ‘খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ধরে রাখার জন্য শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০১২ সাল থেকে আমাদের টিম এটি নিয়ে গবেষণা করছে। ২০১৬ রিও অলিম্পিকের আগে আমরা প্রথম কুলিং ভেস্ট তৈরি করি।’

এরপর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও নিজস্ব গবেষণাগারে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই প্রযুক্তি উন্নত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাকাশচারীদের স্পেসস্যুটকে চরম তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করার জন্য এ ধরনের জ্যাকেট ব্যবহার করা হয়।

২০২৫ সালে বিশ্বখ্যাত গাড়ির প্রতিযোগিতা ‘ফর্মুলা ওয়ানে’ (এফ ওয়ান) মার্সিডিজ দলের চালক জর্জ রাসেল ও কিমি আন্তোনেলি বাহরাইনের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে এই জ্যাকেট পরেছিলেন।

ফুটবলারদের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে অ্যাডিডাস গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করে।

রাককুলিয়া বলেন, ‘আমরা সেই মতামতের ওপর ভিত্তি করে কুলিং ভেস্ট ও জ্যাকেটের ডিজাইন নতুন করে তৈরি করি। ফুটবলের বিরতিগুলো খুব ছোট হয়, তাই ভেস্টগুলো এমনভাবে বানানো হয়েছে যেন খেলোয়াড়রা খুব দ্রুত তা পরতে ও খুলতে পারেন। এজন্য সামনে চেইন যুক্ত করা হয়েছে এবং শরীরের গঠন অনুযায়ী ছোট-বড় করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

অ্যাডিডাসের দাবি, জ্যাকেট ও ভেস্ট একসঙ্গে ব্যবহার করলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ত্বকের তাপমাত্রা প্রায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এটি ওজনেও খুব ভারী নয়, জ্যাকেট ও ভেস্ট মিলিয়ে মাত্র এক কেজি।

এবার বিশ্বকাপে জার্মানি, স্পেন, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকোসহ মোট ১৪টি দেশকে এই বিশেষ কিট সরবরাহ করেছে অ্যাডিডাস।

ব্যবহারের আগে জ্যাকেট ও ভেস্টগুলোকে একদম ঠান্ডা রাখার জন্য বিশেষ ফ্রিজার বক্সে রাখা হয়।

ফুটবলারদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা এই জ্যাকেটের নাম অ্যাডিডাস দিয়েছে ‘অ্যান্থেম জ্যাকেট’।

ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় থেকেই এটি পরে থাকতে পারেন খেলোয়াড়রা।

রাককুলিয়া ব্যাখ্যা করেন, ‘এই জ্যাকেটগুলো শরীরের চারপাশে একটি শীতল আবহ বা মাইক্রোক্লাইমেট তৈরি করে। জ্যাকেটটি ঢিলেঢালা বা ওভারসাইজড হওয়ায় এর ভেতরে বাতাস চলাচলের জায়গা থাকে। এর বাইরের স্তরটি সম্পূর্ণ বাতাস-নিরোধক, ফলে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না। আর এর উজ্জ্বল রুপালি প্রতিফলক পৃষ্ঠটি বাইরের রোদ ও উত্তাপকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়।’

স্পেনের ফিজিও কার্লোস ক্রুজ নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, ‘এই ভেস্টগুলো শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে এনে ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। আমরা অনুশীলনের পর তো বটেই, এমনকি ম্যাচের আগে ওয়ার্ম-আপ সেশনেও এটি ব্যবহার করছি। এতে খেলার সময় অনেক বেশি সতেজ বোধ হয়।’

দ্য অ্যাথলেটিক জানায়, তীব্র গরমে দীর্ঘক্ষণ দৌড়ানোর ফলে খেলোয়াড়দের পা ফুলে যায় এবং বুট জুতা অনেক সময় পায়ে ঠিকমতো ফিট হতে চায় না। ফলে তাদের পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে।

এ জন্য এবার বিশ্বকাপে অনেক ফুটবলারই পা ঠান্ডা রাখতে ব্যবহার করছেন ‘কুলিং ওভারশু’। অ্যাডিডাসের তৈরি এই ওভারশু জুতার ওপরে কিংবা খালি পায়েও ঝটপট পরে নেওয়া যায়।

অ্যাডিডাস জানায়, ওভারশুতে বিশেষ জেল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাত্র কয়েক মিনিটে পায়ের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। হাফটাইমের বিরতিতে ড্রেসিংরুমে ফিরে খেলোয়াড়রা এটি পরে পা দুটিকে দ্রুত ঠান্ডা করে নেন।

ফুটবলারদের কাছ থেকে এই প্রযুক্তির দারুণ ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে উল্লেখ করে অ্যাডিডাস জানায়, অনেকেই ক্লাবে ফিরে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যও এই সরঞ্জাম নিজেদের কাছে রাখতে চেয়েছেন।

নাসা থেকে ফর্মুলা ওয়ান হয়ে ফুটবলে আসা এই প্রযুক্তি এখন টেনিস, ভলিবল, হকি এবং অ্যাথলেটিক্সের মতো অন্যান্য খেলাতেও ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে অ্যাডিডাস।

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় খেলাধুলার জগতে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। সেই বাস্তবতায় ‘স্পেস জ্যাকেট’ ভবিষ্যতের ক্রীড়া প্রযুক্তির নতুন এক প্রতীক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments