Thursday, July 23, 2026
Homeবিশ্বকাপ উন্মাদনার আড়ালে হারারেতে বাংলাদেশের ক্রিকেট বিপর্যয়

বিশ্বকাপ উন্মাদনার আড়ালে হারারেতে বাংলাদেশের ক্রিকেট বিপর্যয়

ফুটবলপাগল বাংলাদেশ এখন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর জ্বরে কাঁপছে। ব্যস্ত নগরীর রাস্তা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের আড্ডা, সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ফুটবল। তবে বিশ্বকাপ উন্মাদনার মাঝেও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, জিম্বাবুয়েতে আসলে কী ঘটছে?

প্রত্যাশিতভাবেই জিম্বাবুয়ে সফরে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্স স্বাভাবিক সময়ের মতো তেমন মনোযোগ পায়নি, কারণ সব আলো কেড়ে নিয়েছে ফুটবল। তবে বিশ্বকাপের জ্বর কেটে গেলে বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গন অবশ্যই জানতে চাইবে, হারারেতে ঠিক কী ঘটেছিল।

ফুটবল উন্মাদনার আড়ালে বাংলাদেশের ক্রিকেট নেমে গেছে এক গভীর নিম্নগামী অবস্থায়। জিম্বাবুয়ের কাছে টানা টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজ হেরে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম হতাশাজনক অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছে টাইগাররা।

এই ব্যর্থতাগুলো আরও বেশি উদ্বেগজনক, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যে দুই সংস্করণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছিল, ঠিক সেখানেই এসেছে এই ধাক্কা।

প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, ‘আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই, তবে হয়তো শক্তিশালী কয়েকটি দলের বিপক্ষে জয়ের পর সেখানে গিয়ে তারা কিছুটা আত্মতুষ্টিতে ভুগেছিল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমার মনে হয় কন্ডিশন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং ছিল এবং তারা সেটার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি।

‘তবে আমার মনে হয়, বিভিন্ন ধরনের কন্ডিশনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট ক্রিকেট আমরা খেলেছি। আমাদের ব্যাটিংও দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক নয়, আর এই সফরেও সেটাই আবার দেখা গেছে।’

জিম্বাবুয়ে সফরের আগে বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ড ও পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দুটি টেস্ট সিরিজ জিতেছিল। ওয়ানডেতেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পরপর চারটি সিরিজ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে তারা জিম্বাবুয়েতে গিয়েছিল। র‌্যাঙ্কিংয়েও এগিয়ে থাকায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ ছিল স্পষ্ট ফেভারিট।

কিন্তু এই সফর আবারও উন্মোচন করেছে সেই পুরোনো দুর্বলতাগুলো, যা দীর্ঘদিন ধরে টাইগারদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল একমাত্র টেস্টটিকে। কিন্তু সেটি পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। খেলার সব বিভাগেই পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ এবং মাত্র তিন দিনের মধ্যে ইনিংস ও ৮৫ রানের বড় ব্যবধানে হেরে যায়। এর মাধ্যমে ২০১১ সালের পর প্রথমবারের মতো জিম্বাবুয়ের কাছে টেস্ট সিরিজ হারল তারা।

যদি টেস্টের ফলাফলকে এক দিনের ব্যর্থতা বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত, তাহলে ওয়ানডে সিরিজের ঘটনাগুলো ছিল আরও বেশি উদ্বেগের।

প্রথম ওয়ানডেতে নাহিদ রানার ক্যারিয়ারসেরা ২১ রানে ৬ উইকেটের দুর্দান্ত বোলিংয়ে জিম্বাবুয়ে মাত্র ১৪১ রানে অলআউট হয়ে যায়। কিন্তু এরপরও অবিশ্বাস্য ব্যাটিং ধসের কারণে বাংলাদেশ ২৫ রানে হেরে বসে।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও চিত্রটা ছিল প্রায় একই।

একসময় ৬ উইকেটে ১৪৮ রানে ধুঁকছিল জিম্বাবুয়ে। কিন্তু বেন কারান ও ব্র্যাড ইভান্স গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে স্বাগতিকদের ৬ উইকেটে ২৪৭ রানের সংগ্রহ এনে দেন।

লক্ষ্য তাড়ায় তানজিদ হাসান তামিম ও তাওহিদ হৃদয়ের হাফসেঞ্চুরিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এই দুই ব্যাটার আউট হওয়ার পর আবারও ভেঙে পড়ে ইনিংস। আরেকটি ব্যাটিং ধস ১৩ রানের হার নিশ্চিত করে এবং জিম্বাবুয়েকে এনে দেয় আরও একটি সিরিজ জয়।

সম্ভবত পরাজয়ের চেয়েও বেশি বিস্ময়কর ছিল ম্যাচ-পরবর্তী ব্যাখ্যাগুলো।

প্রথম ওয়ানডের পর ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল ব্যাটিং ধসের কারণ হিসেবে হারারে স্পোর্টস ক্লাবের বড় বাউন্ডারি ও অতিরিক্ত বাউন্সের কথা উল্লেখ করেন। দ্বিতীয় ম্যাচের পর ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম স্বীকার করেন, ইনিংসের শেষ দিকে আলো কমে আসা একটি আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তবে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল মাঠের আম্পায়ারদের।

এই বিষয়গুলো কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে ঠিকই, কিন্তু পুরো সফরজুড়ে বাংলাদেশের বারবার ব্যাটিং ব্যর্থতার যথেষ্ট ব্যাখ্যা এগুলো নয়।

হারারের তিন ম্যাচেই বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল হতাশার মূল কারণ।

টেস্টে মুমিনুল হকই ছিলেন একমাত্র ব্যাটার যিনি ফিফটি করতে পেরেছেন। প্রথম ইনিংসে তিনি করেন ৬০ রান। অন্য কোনো ব্যাটার ৪০ রানের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। বাংলাদেশ দুই ইনিংসে যথাক্রমে ১৪০ ও ১৮৫ রানে অলআউট হয়, আর জিম্বাবুয়ে তোলে ৪১০ রান।

একই চিত্র দেখা যায় ওয়ানডে সিরিজেও।

প্রথম ওয়ানডেতে ১৪২ রানের লক্ষ্য তাড়া করা ছিল প্রায় আনুষ্ঠানিকতার বিষয়। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ অলআউট হয়ে যায় মাত্র ১১৬ রানে।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে কিছুটা উন্নতির আভাস মিললেও আরেকটি মিডল-অর্ডার ধস সব পরিশ্রম মাটি করে দেয়। দীর্ঘ সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও ১১ বল হাতে রেখেই হার মানতে হয় বাংলাদেশকে।

উদ্বেগের বিষয় শুধু ব্যাটিং নয়।

নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টেস্টে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং ওয়ানডেতে মেহেদী হাসান মিরাজ, দুজনকেই এমন মনে হয়েছে যেন ম্যাচের গতি বারবার জিম্বাবুয়ের দিকে চলে যাওয়ার সময় তাদের হাতে কার্যকর কোনো উত্তর ছিল না। চোটের কারণে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার লিটন দাস ও মোস্তাফিজুর রহমানের অনুপস্থিতিও দলকে আরও দুর্বল করেছে।

ওয়ানডে পরাজয় বাংলাদেশের আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়েও প্রভাব ফেলেছে। ইতোমধ্যে তারা তিনটি রেটিং পয়েন্ট হারিয়েছে। সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হলে ক্ষতি আরও বাড়বে, যা আগামী বছরের আফ্রিকায় অনুষ্ঠিতব্য ক্রিকেট বিশ্বকাপের সরাসরি টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলতে পারে।

এখন শেষ ওয়ানডেতে কিছুটা হলেও সম্মান রক্ষার আশা করবে বাংলাদেশ। তবে বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় কাজটি মোটেও সহজ মনে হচ্ছে না।

উদ্বেগের সংকেত শুধু টেস্ট ও ওয়ানডেতে সীমাবদ্ধ নয়।

টি-টোয়েন্টি সংস্করণেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক নয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ সমতার পর অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ হেরেছে তারা। ব্যাটিং ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে এবং চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নত করতে না পারলে সামনে টাইগারদের জন্য আরও হতাশা অপেক্ষা করতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments