Thursday, July 23, 2026
Homeঅপরাধরাশিয়ায় কাজের ভিসা নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ৩০ বাংলাদেশি

রাশিয়ায় কাজের ভিসা নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ৩০ বাংলাদেশি

কাজের ভিসা ও জনশক্তি রপ্তানির প্রয়োজনীয় সরকারি ছাড়পত্র নিয়ে ৩০ বাংলাদেশি তরুণ গত ২৪ এপ্রিল রাশিয়ায় যান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের মধ্যে অন্তত চারজন নিহত হন।

অভিযোগ রয়েছে, তাদের জোর করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছিল। এ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর কামাল হোসেন ও মো. সৌরভ মোল্লা নামে দুজনের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা পালিয়ে দোনেৎস্ক থেকে ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার সংসদে এ তথ্য জানান প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

মন্ত্রী জানান, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই ৩০ কর্মীর মধ্যে চারজন মারা গেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বাকিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।

তিনি আরও বলেন, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল তারা রাশিয়ায় যান। পরে জানা যায়, সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের একটি ক্যাম্পে জোর করে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।

এ ঘটনায় বিপদাপন্ন বাংলাদেশি কর্মীদের উদ্ধারে এবং দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নিতে গত ১৫ জুন মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে চিঠি দেয় মন্ত্রণালয়।

এর আগে ২৫ মে দূতাবাস থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মস্কোর বাংলাদেশ মিশন গত ৫ মে ঢাকাকে সতর্ক করেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, জালাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ‘প্রো-টেকনোলজিস লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানি’ নামে ওরেনবুর্গভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানে ৩০ বাংলাদেশিকে পাঠানো হয়েছিল।

দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে জালাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের কোনো নথি দূতাবাসের শ্রম উইং সত্যায়ন করেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এর আগে আরএস ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি রিক্রুটিং এজেন্সি একই রুশ প্রতিষ্ঠানে ৭০ কর্মী পাঠানোর জন্য গত মার্চে জনবল চাহিদাপত্র জমা দিয়েছিল।

নথিপত্র যাচাই করে দূতাবাস তাতে বিভিন্ন ভুল ও অসঙ্গতি দেখতে পায় এবং সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠায়।

সন্দেহের কারণে বিদেশগামী কর্মীদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নথি আপলোডসহ সত্যায়ন প্রক্রিয়ার কয়েকটি ধাপ স্থগিত রাখা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এরপর বাংলাদেশ দূতাবাস রুশ কোম্পানি ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চায়, বাংলাদেশি কর্মীদের ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর কোনো ঝুঁকি আছে কি না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয় পক্ষ মৌখিকভাবে দূতাবাসকে আশ্বস্ত করে যে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না। তারা ওরেনবুর্গে একটি ড্রোন কারখানায় কাজ করবেন।

দূতাবাস প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পরিদর্শনেরও চেষ্টা করে। তবে সেটি একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে হওয়ায় রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের পূর্বানুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশের সুযোগ ছিল না।

১৮ মে এক বাংলাদেশি কর্মীর স্বজন দূতাবাসে ফোন করে জানান, কর্মীদের দোনেৎস্কের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং গোপনে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

এরপর দূতাবাস নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করে এবং ২৫ মে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি নোট ভারবাল পাঠিয়ে ঘটনার তদন্ত ও জরুরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়।

প্রতিবেদনে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে সব কর্মীকে নিজস্ব খরচে দেশে ফিরিয়ে আনতে রিক্রুটিং এজেন্সি ও রুশ প্রতিষ্ঠানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগেরও সুপারিশ করা হয়।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে কামাল ও সৌরভ দোনেৎস্কের একটি দোকান থেকে ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তারা জানান, তাদের কাছে আর বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই।

তিনি বলেন, ব্র্যাক সঙ্গে সঙ্গে মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ ও পাসপোর্টের তথ্য দূতাবাসকে দেয়। তখন তারা দোনেৎস্কের স্টেপানোভকা এলাকায় বা তার আশপাশে ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ব্র্যাক আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্ধার সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল।

তার ভাষায়, তারা জানিয়েছিল, রুশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ওই এলাকায় তাদের কিছু করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, পরদিন ব্র্যাক জানতে পারে, কামাল ও সৌরভকে আটক করা হয়েছে।

শরিফুল বলেন, তারা একটি বাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের রুশ কমান্ডার দেখে ফেলেন। তিনি তাদের আটকে নিকটস্থ চেকপোস্টে খবর দেন। পরে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি এসে তাদের নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, তারা এখন জীবিত না মৃত, সেটিও আমরা জানি না।

কামাল ও সৌরভের কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট, রাশিয়ার কর্মভিসা এবং বিএমইটির ইসি কার্ড ছিল। এসব নথিতে গন্তব্য দেশ হিসেবে রাশিয়ার নাম উল্লেখ ছিল। এগুলো চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল ইস্যু করা হয়েছিল।

শরিফুল ইসলাম বলেন, এখন অনেক বাংলাদেশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়ে আছেন। ভালো বেতন ও রুশ নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সেখানে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন তারা না বেতন পাচ্ছেন, না দেশ ছেড়ে বের হতে পারছেন।

তিনি আরও বলেন, অনেক বাংলাদেশি রুশ ভাষা পড়তে বা বুঝতে পারেন না। ফলে চুক্তিপত্রে সই করার সময় তারা পুরোপুরি দালাল ও নিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন।

তার ভাষায়, তাদের বলা হয়, কাজের জন্য চুক্তিতে সই করতে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তারা বুঝতে পারেন, সেই চুক্তিই তাদের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments