Friday, July 24, 2026
Homeআর্জেন্টিনার নীল জার্সির 'কুসংস্কার' নিয়ে যা বললেন ইংল্যান্ড কোচ

আর্জেন্টিনার নীল জার্সির ‘কুসংস্কার’ নিয়ে যা বললেন ইংল্যান্ড কোচ

আটলান্টার সেমিফাইনালে যখন ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, তখন লিওনেল মেসিদের গায়ে প্রথাগত আকাশি-সাদা জার্সি দেখা যাবে না। তারা মাঠে নামবেন গাঢ় নীল রঙের অ্যাওয়ে জার্সি পরে। ফুটবলবিশ্বে আর্জেন্টিনার এই নীল জার্সি এখন কেবল একটি বিকল্প পোশাক নয়, বরং এটি তাদের ফুটবল লোকগাথার অংশ। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কিছু স্মৃতি আর খানিকটা ‘ভাগ্যের ছোঁয়া’ যেন মিশে আছে এই জার্সির সুতোয়।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই নীল জার্সির ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং নাটকীয়। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপেও গাঢ় নীল জার্সি পরেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা করেছিলেন তার সেই কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল, আর এর কিছুক্ষণ পরেই ফুটবলপ্রেমীদের উপহার দিয়েছিলেন ‘শতাব্দীসেরা’ একক ড্রিবলিংয়ের সেই অবিশ্বাস্য গোল।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল ঠিক ১২ বছর পর। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আবারও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি যখন আর্জেন্টিনা, তখনও তাদের গায়ে ছিল সেই নীল জার্সি। নির্ধারিত সময়ের ২-২ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে মাঠ ছেড়েছিল আলবিসেলেস্তেরা।

মুদ্রার ওপিঠ: নীল জার্সির কান্নাও কম নয়

তবে এই নীল জার্সি কি শুধুই সৌভাগ্যের? ইতিহাস কিন্তু অন্য সাক্ষ্যও দেয়। এই গাঢ় নীল জার্সি পরেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় কিছু ট্র্যাজেডি ঘটেছিল, যা আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের আজীবন তাড়া করে বেড়াবে।

১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি কেউ। সেবার এই নীল জার্সি গায়ে চাপিয়েই পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে বিতর্কিত এক পেনাল্টিতে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা ভাঙার কান্নায় ভেঙে পড়েছিল তারা।

এখানেই শেষ নয়, ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপেও কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হওয়ার দিন আর্জেন্টিনার গায়ে ছিল এই অভিশপ্ত নীল জার্সি। রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর টাইব্রেকারে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল পেকারম্যানের শিষ্যদের। এমনকি ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে মারাকানায় যখন মারিও গোটশের অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন চূর্ণ হয়, তখনও মেসিদের গায়ে জড়ানো ছিল ওই গাঢ় নীল জার্সিই!

টুখেলের উপলব্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ স্তরের পেশাদার খেলাতেও এমন মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাস বা কুসংস্কার যে কতটা প্রভাব ফেলে, তা বেশ ভালোই বোঝেন ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল। আর্জেন্টিনার এই জার্সি রহস্য নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

জার্সি বদলের এই কৌশলের প্রশংসা করে টুখেল বলেন, ‘এর সঙ্গে যদি কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বাস বা কুসংস্কার জড়িয়ে থাকে, তবে আমি হলেও ঠিক একই কাজ করতাম। তাই তাদের কৃতিত্ব দিতেই হয়। যদিও বিষয়টি আমার জানা ছিল না।’

নিজের ভেতরের কিছু বিশ্বাসের কথা জানিয়ে হাসতে হাসতে এই জার্মান কোচ আরও বলেন, ‘আমার নিজেরও কিছু বিশ্বাসের রুটিন আছে। তবে সেটা আপনাদের বলব না। কারণ, আরেকটা বিশ্বাস হলো—যদি আমি এটা ফাঁসের চেষ্টা করি, তবে তা আর কাজ করবে না। উচ্চস্তরের খেলাধুলায় নিজেকে শান্ত ও স্থির রাখার জন্য এমন কিছু রুটিন বা সৌভাগ্যের প্রতীক থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।’

স্কালোনির নির্লিপ্ততা

জার্সি নিয়ে যখন চারদিকে এত আলোচনা, তখন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য বিষয়টিকে একপ্রকার এড়িয়েই গেছেন। কিছুটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে নীল জার্সির জন্য বলিনি। কে বলেছে জানি না, তবে হয়তো এটা ঐতিহ্যগত কোনো বিষয়। আমি এ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। আর টমাসের যদি এতে কোনো আপত্তি না থাকে, তবে আমারও নেই।’

আর্জেন্টিনার এই গাঢ় নীল জার্সির নকশায় রয়েছে দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতির দারুণ এক ছোঁয়া। কালো রঙের ভিত্তির ওপর নীল রঙের ‘ফিলেতেয়াদো’ ঘরানার আলপনা করা হয়েছে এতে। ‘ফিলেতেয়াদো’ হলো বুয়েনস আইরেসের একটি ঐতিহ্যবাহী আলংকারিক শিল্পশৈলী, যা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত। জার্সির গায়ে ফুটিয়ে তোলা এই উজ্জ্বল রঙ, ফুলের নকশা আর ত্রিমাত্রিক শ্যাডিং যেন আর্জেন্টিনার সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকেই ধারণ করছে।

এটি শুধুই একটি জার্সি, নাকি মাঠের জাদুকরী কোনো সৌভাগ্যের প্রতীক—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments