Friday, July 24, 2026
Homeঅপরাধউত্তোলনের তুলনায় মাটির নিচে পানি জমছে কম, খরাপ্রবণ এলাকায় বড় শঙ্কা

উত্তোলনের তুলনায় মাটির নিচে পানি জমছে কম, খরাপ্রবণ এলাকায় বড় শঙ্কা

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির মজুত পূরণ হওয়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে গেছে। স্বাভাবিকভাবে বছরে ১০০ থেকে ৫১৫ মিলিমিটার পানি ভূগর্ভস্থ স্তরে জমা হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে তা কমে ১০০ থেকে ২১০ মিলিমিটারে নেমে এসেছে।

উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভের পানি নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। এতে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে পানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

এই সাতটি জেলা হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, জয়পুরহাট এবং দিনাজপুর, নাটোর ও বগুড়ার কিছু অংশ।

গতকাল ঢাকায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক কর্মশালায় ‘বরেন্দ্র এরিয়া রেজিলিয়েন্ট অ্যান্ড ইনোভেটিভ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন গৌতম চন্দ্র মৃধা। তিনি ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) সেচ, ভূগর্ভস্থ পানি ও জলাভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক।

এই গবেষণায় ১৯৮৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বৃষ্টিপাত, পানির স্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮৫ সালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১৬ মিটার গভীরে ছিল। ২০২৫ সালে এসে তা ৩৬ মিটারে পৌঁছেছে। শুষ্ক মৌসুমে নাচোল, তানোর, নিয়ামতপুর এবং পোরশা উপজেলার কিছু এলাকায় পানির স্তর ৩৩ থেকে ৩৬ মিটার নিচে নেমে যায় বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গৌতম চন্দ্র মৃধা জানান, বৃষ্টির পানির কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশই চুইয়ে মাটির নিচে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আবার পূরণ করে। বাকি পানি মাটি দিয়ে গড়িয়ে নষ্ট হয় অথবা নদীতে গিয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘অন্যান্য এলাকার তুলনায় এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি পুনরায় জমা হওয়ার হার অনেক ধীর।’

গৌতম চন্দ্র মৃধা আরও বলেন, মাটির নিচে যে পরিমাণ পানি জমা হয়, তার তুলনায় বেশি পানি তুলে ফেললে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এতে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। তখন গভীর থেকে সেচের জন্য পানি তোলায় খরচ বাড়ে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এভাবে পানি তোলা অব্যাহত থাকলে একপর্যায়ে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে। তখন চরম পানিসংকট তৈরি হবে।’

তিনি বলেন, কিছু কিছু এলাকায় সেচপাম্প চালানোর সময় কমানো হলেও সমস্যা কমছে না। ব্যক্তি উদ্যোগে যথেচ্ছভাবে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হচ্ছে এবং এর কোনো নজরদারি নেই। এমনকি কিছু মানুষ ভূগর্ভস্থ পানি বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

এই সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন গৌতম চন্দ্র মৃধা। বেসরকারি নলকূপগুলোকে নজরদারি ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং বোরো ধানের চাষ কমিয়ে অন্য ফসলে জোর দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি। 

এ ছাড়া বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩ ও পানি বিধিমালা ২০১৮-এর আওতায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলার আইনি সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগ করার কথাও বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হোমনাথ ভান্ডারি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের ধান উৎপাদন চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত পানি তোলার কারণে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বোরো চাষের সেচের ৯১ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ থেকে। এতে পানির স্তরে বাড়তি চাপ পড়ছে। ফলে এই অঞ্চল এখন পানিসংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

তিনি ‘অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং’ বা পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানোর প্রযুক্তির ব্যবহার, ভূপৃষ্ঠের পানি (সারফেস ওয়াটার) সেচ সম্প্রসারণ এবং আউশ ও আমনের মতো কম পানি দরকার হয় এমন ধানের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে এডিবির কৃষি, খাদ্য, প্রকৃতি ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতের এমার্জিং এরিয়াস বিভাগের পরিচালক তাকেশি উয়েদা বলেন, টেকসই এবং জলবায়ুসহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে বরেন্দ্র অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এডিবির মধ্যমেয়াদি সহায়তা কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো—বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান তৈরি, অর্থনৈতিক সংযোগ উন্নত করা এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই উদ্যোগ সেই কৌশলের সঙ্গেই মানানসই।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদ বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৬টি জেলা বর্তমানে দেশের ৪২ শতাংশ ধান উৎপাদন করে। আমাদের লক্ষ্য এটিকে ৪৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কেবল ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে পারি না। বোরো মৌসুমের জন্য আমাদের ভূপৃষ্ঠের পানি ধরে রাখতে হবে। সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া বরেন্দ্র অঞ্চলে বড় পরিসরে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments