Friday, July 24, 2026
Homeঅপরাধ‘মুই মইরবার আগোত খুনিগুলার শাস্তি দ্যাখবার চাং’

‘মুই মইরবার আগোত খুনিগুলার শাস্তি দ্যাখবার চাং’

দুপুরের রোদে বারান্দায় বসে আছেন মনোয়ারা বেগম। তার হাতে ফ্রেমবন্দি একটি ছবি—তার ছেলে আবু সাঈদের। দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির পাশে লেখা, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের বাবনপুর গ্রামের ছোট্ট আধাপাকা বাড়িটির প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য এটি।

দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারে সময় বদলেছে, ঋতু পাল্টেছে। কিন্তু এই পরিবারের কাছে সময় যেন থেমে আছে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ে—যেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।

মনোয়ারা কখনো শাড়ির আঁচল দিয়ে ফ্রেমে জমে থাকা ধুলা মোছেন, কখনো নির্বাক তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে। কিছুক্ষণ পরই তার চোখ ভিজে যায়।

‘মোর সাঈদটা কই গেল রে…মোর ছইলডা তো আর ফিরল না…’ কেঁদে ওঠেন মনোয়ারা।

তিনি বলেন, ‘মোর ছইলটা (ছেলে) যামরাগুলা (যারা যারা) গুলি করি মারি ফ্যালাইছে। আদালত রায় দিছে, কিন্তু অ্যালাং (এখনো) রায় কার্যকর হইলো না। মুই মইরবার আগোত (আগে) খুনিগুলার শাস্তি দ্যাখবার চাং (চাই)। যার বুকের ধন চলি যায়, সেই বোঝে কত কষ্ট। মোর ছইলডা কি আর ফিরি আইসবে? টাকা-পয়সা দিয়া কি ছইল ফিরি আনা যায়?’

এরপর আর কথা শেষ করতে পারেননি তিনি। গলা ধরে আসে মনোয়ারার।

ঘরের কোণে রাখা পুরোনো একটি ব্যাগে এখনো যত্ন করে সাজিয়ে রাখা আছে আবু সাঈদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র, ইংরেজি সাহিত্যের কয়েকটি বই, কিছু খাতা আর একটি কলম।

আঙুলের ইশারায় ব্যাগটি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এইল্যা মুই কাকো ধইরবার দ্যাং না। এইল্যা মোর ছইলের স্মৃতি।’

গত এক মাস ধরে অসুস্থ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। তার বেশির ভাগ সময়ই কাটে বিছানায়। কথা বলতে গেলেই চোখ ভিজে যায়।

‘হামার ছইলডা খুব মেধাবী আছিলো বাহে। বাঁচি থাকিলে বড় চাকরি পাইলো হয়। ওই ছইলডায় হামার সব স্বপ্ন আছিলো। হামার খবর নিছিলো। ছইলডাক গুলি করি মারার পর থাকি মুই ঠিক মতো নিনদিবার পাবার নাইকছোং না (ঘুমাতে পারছি না)। চোখ বন্ধ করলেই ছইলডার মুখ ভাসি উঠে। শুধু একটা প্রশ্ন—খুনিগুলার ফাঁসি কোনদিন হইবে?’

সাঈদের বড় ভাই আবু রায়হান বলেন, পরিবারের সবচেয়ে দায়িত্বশীল মানুষ ছিল আবু সাঈদ। নিজের পড়াশোনার খরচ টিউশনি করে চালাতো। শুধু তাই নয়, সেই আয় থেকেই বাবা-মায়ের খরচ দিতো, সংসারেও সহযোগিতা করতো। পরিবারের কারও কোনো সমস্যা হলে সবার আগে ছুটে আসতো সে।

‘সে কখনো সহিংসতায় বিশ্বাস করতো না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতো, কিন্তু কাউকে আঘাত করার শিক্ষা পরিবার থেকে পায়নি,’ বলেন তিনি।

ছোট বোন সুমি আক্তার বলেন, ‘আমার ভাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য শহীদ হয়েছেন। কিন্তু দুই বছর পরও সেই ন্যায় পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি। ভাইয়ের স্মৃতিকে সংরক্ষণের জন্য বড় প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। খুব কষ্ট লাগে—তার আত্মত্যাগ নিয়ে সবাই কথা বলে, কিন্তু তার পরিবারের জন্য কেউ তেমন কিছু করছে না।’

মামলার বাদী ও বড় ভাই রমজান আলী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে পরিবার সন্তুষ্ট। এখন অপেক্ষা শুধু রায় কার্যকরের।

‘যেদিন রায় কার্যকর হবে, সেদিন মনে কিছুটা শান্তি পাব। শুধু আমাদের নয়, জুলাইয়ের সব শহীদ পরিবারের জন্যও দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর হওয়া জরুরি। অনেকে বলে, সময় সব ক্ষত শুকিয়ে দেয়। কিন্তু ভাই হারানোর ক্ষত শুকায় না। বরং দিন যত যায়, ততই বুঝি—ও আর কোনোদিন ফিরবে না।’

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটসংলগ্ন পার্ক মোড়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে শত শত শিক্ষার্থী অবস্থান করছিলেন। দুপুর নাগাদ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। পরে শুরু হয় গুলি। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেলেও আবু সাঈদ পিছু হটেননি। দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। কয়েক সেকেন্ড পরই গুলির শব্দ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ। সহপাঠীরা রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী শাহরিয়ার শান্ত বলেন, ‘সেদিন শুধু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়নি, জন্ম নিয়েছিল একটি প্রতীক।’

ঘটনাস্থলে ধারণ করা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিরস্ত্র তরুণকে হত্যার সেই দৃশ্য।

আবু সাঈদের মৃত্যু জুলাই আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয় এবং পরবর্তী গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হয়ে ওঠে।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে পুলিশের দুই সাবেক সদস্য—সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও আরও ২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

চব্বিশের সেই উত্তাল আন্দোলনের পর কেটে গেছে দুই বছর। অথচ গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) অবকাঠামোগত উন্নয়নে ঘোষিত প্রায় ১ হাজার ১০ কোটি টাকার মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বহুল আলোচিত এই প্রকল্পের আওতায় শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতি জাদুঘর, তোরণ, স্মৃতিস্তম্ভ, স্ট্রিট মেমোরি
স্ট্যাম্প, গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের ১৬ জুলাই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এসব স্থাপনার ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়। কিন্তু সেই ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক ছাড়া বাস্তবে আর কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।

এ নিয়ে আবু সাঈদের সহপাঠী, বর্তমান শিক্ষার্থী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে
ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

সে সময় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, শুধু স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ধারণকারী একটি স্মৃতি কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে স্থাপন করা ভিত্তিপ্রস্তরের ফলকটি
অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। আশেপাশে নির্মাণকাজের কোনো প্রস্তুতি কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃশ্যমান চিহ্ন নেই।

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা শহীদ আবু সাঈদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি দেখতে এলেও সেখানে স্থায়ী কোনো স্মারক না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

কুমিল্লা থেকে আসা দর্শনার্থী আবিদুর রহমান বলেন, ‘শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে—দেশ, মানুষের অধিকার ও ন্যায়ের জন্য একজন তরুণও ইতিহাস বদলে দিতে পারেন। শুনেছিলাম তার স্মৃতিকে ঘিরে এখানে বড় পরিসরে কিছু নির্মাণ হবে। কিন্তু এসে দেখলাম, শুধু একটি ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক। এটা সত্যিই হতাশাজনক।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সভা-সমাবেশে শহীদ আবু সাঈদের নাম ব্যবহার করা হলেও তার স্মৃতি সংরক্ষণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। অথচ প্রথম শহীদের নামে ঘোষিত তোরণ, জাদুঘর কিংবা স্মৃতিস্তম্ভের কাজই শুরু হয়নি। এটি শুধু একটি প্রকল্পের বিলম্ব নয়, বরং ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বড় ব্যর্থতা।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত আলী বলেন, ‘ডিপিপি ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। ইউজিসির অনুমোদনের পর এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন মিললেই নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments