Thursday, October 22, 2026
Homeঅপরাধ৫ বছরে শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা সরকারের

৫ বছরে শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরিকল্পনা সরকারের

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা করেছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে এসব খাতে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদী সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে শিক্ষায় শিখন দারিদ্র্য ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ শতাংশে নামানো হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ২০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

একই সময়ের মধ্যে চিকিৎসার মোট ব্যয়ের যে অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, তা কমিয়ে ৫০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

‘শিখন দারিদ্র্য’ বলতে সাধারণত ১০ বছর বয়সের মধ্যে কোনো শিশুর সহজ লেখা পড়তে ও বুঝতে না পারাকে বোঝায়।

পাঁচ বছরের সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোতে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, দুই খাতেই সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনার অর্থায়নের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে বাংলাদেশের নামমাত্র জিডিপি প্রায় ১১২ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এর ৫ শতাংশ দাঁড়াবে প্রায় ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই খাত মিলিয়ে বছরে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা।

এর তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। এটি জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।

দুই খাত মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ২ লাখ ৬ হাজার ১৫ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ করে ব্যয় করা গেলে দুই খাতে মিলিত বার্ষিক ব্যয় বর্তমান বরাদ্দের প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এই পাঁচ বছরের কাঠামো তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত এই পরিকল্পনা কার্যকর থাকবে। গত ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ এটি অনুমোদন করেছে।

পরিকল্পনার সঙ্গে একটি কর্মপরিকল্পনাও দেওয়া হয়েছে। এতে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের জন্য বিভিন্ন লক্ষ্য ও কাজ নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই এই পরিকল্পনার মূল বিষয় নয়। কোথায় এবং কীভাবে টাকা খরচ হবে, সেটিও নির্দিষ্ট করা জরুরি।

তিনি বলেন, শিক্ষা খাতে আগে প্রয়োজনীয় জায়গায় অনেক সময় প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য খাতেও আগের পরিকল্পনাগুলোতে কোথায় টাকা খরচ হবে, তা স্পষ্ট না থাকায় অনেক বরাদ্দ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

তিতুমীর বলেন, এবার পরিকল্পনায় বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

এর উদাহরণ হিসেবে তিনি উপজেলা হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০টিতে উন্নীত করা, চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ এবং ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলেন।

তিনি বলেন, ব্যয় বাড়বে। তবে এতে সমস্যা নেই। দেশের প্রয়োজনের তুলনায় জাতীয় বাজেটের আকারই বরং ছোট।

এক বছরের মধ্যে কর্মসংস্থানমুখী, দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা নীতি চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সময়ের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে।

এই কমিশন শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করবে।

এক বছরের মধ্যে ছেলে ও মেয়েদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি উপবৃত্তির আওতা বাড়ানো হবে।

পরিকল্পনায় কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এক বছরের মধ্যে কারিগরি বিষয় যুক্ত করে নতুন পাঠ্যক্রম তৈরি করা হবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কোর্স নির্ধারণ করা হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি এবং মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে কারিগরি ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

পাঁচ বছরের মধ্যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অন্তত একটি কারিগরি বা বৃত্তিমূলক কাজের দক্ষতা অর্জন করানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ১৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০৩১ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশ করার লক্ষ্য রয়েছে।

ডিজিটাল শিক্ষার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এক বছরের মধ্যে শিক্ষকদের ট্যাব দেওয়া হবে। একই সময়ের মধ্যে এমন একটি শিক্ষা পরিচালনাব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার উপকরণ, মূল্যায়ন, উপস্থিতি ও ফলাফল সংরক্ষণ করা যাবে।

মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে স্মার্ট শ্রেণিকক্ষও স্থাপন করা হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে সব শিক্ষককে আধুনিক ট্যাব ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শব্দ-ছবি ও ইন্টারেক্টিভ শিক্ষাব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষার সংস্কারে মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ সহজ করা। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিশেষ সেল এবং নিয়মিত চাকরির মেলার আয়োজন করা হবে।

স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তিন থেকে ছয় মাসের বেতনভুক্ত ইন্টার্নশিপ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইন্টার্নশিপের সময়কে একাডেমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে গণ্য করা হবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এক বছরের পরিকল্পনায় আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন এবং আটটি আঞ্চলিক শাখায় ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। বাধ্যতামূলকভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ও কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত দক্ষতার কোর্সও চালু করা হবে।

দীর্ঘমেয়াদে দুই বছরের একটি বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট দূর করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে পাঠ্যক্রম সাজানো হবে।

এক বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণাগার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যও রয়েছে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যেতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশেষ ঋণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি সহায়তায় বিশেষ ঋণ দেওয়া হবে। এ জন্য অনলাইন ঋণ ব্যবস্থাও চালু করা হবে।

এই ঋণের ক্ষেত্রে বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পত্তি বন্ধক বা জামিনদারের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর ডিগ্রির সনদ জামানত হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব রয়েছে।

তিতুমীর বলেন, শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রে থাকবে কর্মসংস্থান। একজন মানুষ আশা করেন, শিক্ষা শেষ করে তিনি কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন সম্প্রসারণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নানা দুর্বলতার কারণে শিক্ষিত বেকারত্ব বেড়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে এক বছরের মধ্যে ১ হাজার ৩১৩টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৩ হাজার ২০০টি পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তরের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হবে।

অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষ কর্নারের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। এসব কর্নার ৪৪৬টি স্থানে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পাঁচ বছরের মধ্যে মোট ৪ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে দেশের ৬৪ জেলায় একটি সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় প্রায় ৩ হাজার সাধারণ চিকিৎসকের ইউনিট চালুর লক্ষ্যও রয়েছে।

এক বছরের মধ্যে বিদ্যমান পদে ২ হাজার ৩৯৪ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ৫২০ জন মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পাঁচ বছরে আরও ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার নার্স ও মিডওয়াইফের পদ সৃষ্টি এবং এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

পুরো দেশে পাঁচ বছরে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বড় লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আরও প্রায় ১৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

এক বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৭০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যমান জেলা হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, করোনারি কেয়ার ইউনিট, ডায়ালাইসিস ও কেমোথেরাপি সেবা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

১৭০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঢাকায় ও চট্টগ্রামে স্থাপন করা হবে। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি জেলায় আধুনিক মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে।

জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য দুই জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে অ্যাম্বুলেন্স শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।

জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য ১৬২৬৩ নম্বরের কল সেন্টারও চালু করা হবে। পরে জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা ও জরুরি সেবার নেটওয়ার্ক সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

খুলনায় ২৫ লাখ মানুষের জন্য চালু করা পরীক্ষামূলক ই-স্বাস্থ্য কার্ড ব্যবস্থার মূল্যায়ন করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে সারা দেশে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

২০৩১ সালের মধ্যে দেশের অর্ধেক মানুষকে সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যও নেওয়া হয়েছে।

তিতুমীর বলেন, সরকার এখন বাজেট ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করছে। প্রকল্প তৈরি, প্রস্তুতি এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তদারকিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের ঋণের চাপ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments