Thursday, October 22, 2026
Homeঅপরাধনামেই যাত্রীছাউনি, কাজে আসে না যাত্রীদের, দাঁড়ায় না বাস

নামেই যাত্রীছাউনি, কাজে আসে না যাত্রীদের, দাঁড়ায় না বাস

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের কাছে, পল্টন থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে একটি যাত্রীছাউনি আছে। তবে প্রথম দেখায় বোঝা কঠিন যে এটা কোনো যাত্রীছাউনি। সারাদিন হকার ও ভাসমান দোকানের দখলে থাকে জায়গাটি।

ওই এলাকা দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করা চাকরিজীবী মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ছাউনির নিচে বসার কোনো জায়গা নেই। তাই বাসের জন্য রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়।’

ঢাকার যাত্রীছাউনিগুলোতে ফুটপাত, পানযোগ্য পানি, ওয়াই-ফাই, চায়ের ব্যবস্থা ও মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার সুবিধার মতো সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভাঙা বেঞ্চ, ফুটো হয়ে যাওয়া ছাদ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, চারদিকে ময়লা-আবর্জনা আর হকারদের দখল!

গণপরিবহনের যাত্রীদের জন্য রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর পাশে এসব অবকাঠামো নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব যাত্রীছাউনির সামনে বাস থামে না।

রাজধানীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে ৬১টির বেশি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে প্রায় ৭০টিসহ মোট ১৩০টির বেশি পুরোনো ও নতুন যাত্রীছাউনি রয়েছে।

এর মধ্যে ২০২১ সালে বাস রুট রেশনালাইজেশন কর্মসূচির আওতায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে ১০০টির বেশি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল, নির্দিষ্ট জায়গায় বাস থামার ব্যবস্থা করা, যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়ানো এবং যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমানো।

তবে পাঁচ বছর পর দেখা যাচ্ছে, যাত্রীছাউনি দিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি।

শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের বিপরীতে থাকা ডিএসসিসির একটি যাত্রীছাউনিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভাসমান মানুষ ঘুমাচ্ছেন। সেখানে কোনো যাত্রী অপেক্ষা করছিলেন না, কারণ বাসগুলো সেখানে খুব একটা থামে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলী আহসান বলেন, ‘অনেকক্ষণ ধরে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে দেখলাম, কোনো বাসই যাত্রীছাউনিতে থামল না। সবাই শাহবাগ মোড় থেকে যাত্রী তুলছে। যাত্রী বা বাসচালক, কেউই নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়ায় না। এ কারণে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।’

যাত্রীরা আরও অভিযোগ করেন, বৃষ্টির সময় ছাউনি থেকে খুব একটা সুরক্ষা পাওয়া যায় না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের পাশে চানখাঁরপুলের যাত্রীছাউনিটিতে সহজেই বৃষ্টির পানি ভেতরে চলে আসে।

বনানীর কাকলী এলাকায় ছাদ ভাঙা একটি যাত্রীছাউনিতেও একই চিত্র দেখা যায়।

মিরপুর আনসার ক্যাম্প, মতিঝিল, বাড্ডা ও রামপুরার মতো অনেক ব্যস্ত এলাকায় পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নেই। অন্যদিকে, এমন অনেক জায়গায় ছাউনি বানানো হয়েছে, যেখানে বাস থামেই না, ফলে সেগুলো অব্যবহৃতই থাকছে।

গুলশান-১ লেক রোডে ডিএনসিসির একটি যাত্রীছাউনি ফলের বাজারে পরিণত হয়েছে। সেখানে আজিমপুরের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সাজ্জাদ ইবনে কামাল। তিনি বলেন, ‘ছাউনিটি হকারদের দখলে, আর বাসও সেখানে থামে না। তাই সবাই মোড়েই অপেক্ষা করে।’

নিউমার্কেট এলাকায় একটি যাত্রীছাউনিতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙা বেঞ্চ, ঝুলিয়ে রাখা কাপড়চোপড় আর রাস্তার পাশের দোকানের কারণে সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে ব্যবসায়ীরা যাত্রীছাউনিকে মালামাল রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে শিশু একাডেমির সামনের যাত্রীছাউনির বেঞ্চগুলোকে গাছের চারা প্রদর্শনের র‍্যাক বানানো হয়েছে। ভাসমান মানুষকে ঘুমাতে দেখা যায় কলাবাগানের যাত্রীছাউনির বেঞ্চে।

শ্যামলী, গাবতলী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, মালিবাগ, কুড়িল ও সায়েদাবাদের যাত্রীছাউনিগুলোর অবস্থাও প্রায় একই রকম।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী যাত্রীছাউনিগুলোকে দখলমুক্ত করে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এসব অবকাঠামো নির্মাণের সময় যাত্রীদের চাহিদা, স্থানীয় আবহাওয়া, পরিবহন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের কথা মাথায় রাখা উচিত।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ২০২১ সালের বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পে যাত্রীছাউনিগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি। বাসগুলো ছাউনির সামনে না থামায় এগুলোর উপযোগিতা যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি শহরের পরিবহন উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে, যাত্রীছাউনিগুলোকে বাস বে, ফুটপাত এবং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার আওতায় আনা উচিত।

ডিএসসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব খাদেম জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ছাউনি নষ্ট হয়ে গেছে। সিটি করপোরেশন ক্ষতিগ্রস্ত ছাউনিগুলো সংস্কারের পাশাপাশি প্রয়োজনে নতুন ছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।

ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) নাঈম রায়হান খান বলেন, এসব ছাউনির জন্য আলাদা কোনো বাজেট না থাকায় নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ করা বেশ কঠিন হয়ে যায়। এরপরও আমরা সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্ত ছাউনিগুলো মেরামতের চেষ্টা করি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments