Saturday, July 25, 2026
Homeঅপরাধঅভিযানেও থামছে না রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বনে বালু লুট

অভিযানেও থামছে না রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বনে বালু লুট

অভিযান, মামলা, যন্ত্রপাতি জব্দ ও গ্রেপ্তারের পরও চট্টগ্রামের রামগড়-সীতাকুণ্ড সংরক্ষিত বনে থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কর্মকাণ্ডে বনটির বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সংরক্ষিত বন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে অন্তত ২১টি অভিযান চালানো হয়েছে।

এসব অভিযানে ১১টি বালুবাহী ট্রাক, দুটি এক্সকাভেটর, ১৬টি ড্রেজার, একটি শ্যালো ইঞ্জিন, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত হাজার হাজার ফুট পাইপ এবং এক লাখ সাত হাজার ঘনফুটের বেশি বালু জব্দ বা ধ্বংস করা হয়েছে। এ সময় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নথিপত্রে দেখা গেছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনা বারবার ঘটছে কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায়। এর মধ্যে করেরহাট ও মীরসরাই রেঞ্জের আওতাধীন সংরক্ষিত বনের ঝিলতলী ও চিকন ছড়া সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। ঝিলতলীতে অন্তত পাঁচবার ও চিকন ছড়ায় অন্তত চারবার অভিযান চালানো হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। অভিযান চালিয়ে যন্ত্রপাতি জব্দ করার কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একই স্থানে আবার বালু উত্তোলন শুরু হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের করেরহাট জোনের সহকারী বন সংরক্ষক মাহদি হাসান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তথ্য পেলেই আমরা অভিযান চালাই। যন্ত্রপাতি জব্দ করি, মামলা করি, আর হাতেনাতে কাউকে পেলে গ্রেপ্তার করি। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই অপারেটররা আবার অবৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু করে।’

১৮৯৩ সালে তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল বন বিভাগের অধীনে কলকাতা গেজেটে রামগড়-সীতাকুণ্ড বনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এ বনাঞ্চলের আয়তন ৮৪ হাজার একরেরও বেশি।

 

গুরুত্বপূর্ণ জলাধার, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও পরিবেশগত সুরক্ষাবলয় হিসেবে পরিচিত এ বনটিতে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১২৩ প্রজাতির পাখি, আট প্রজাতির সরীসৃপ ও অন্তত ২৫ প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ঝিলতলী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে একটি সরু পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাকৃতিক গঠন দৃশ্যমানভাবে বদলে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক কৃষক ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘প্রতিদিন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত ড্রেজার দিয়ে তোলা হয় বালু। পরে ডাম্প ট্রাকে করে সেই বালু কয়লা বাজার সড়ক দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়।’

স্থানীয়রা জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনকারীরা বনাঞ্চলে প্রবেশের বিভিন্ন সড়কে নজরদারির জন্য লোক মোতায়েন করে রাখে। প্রশাসন বা বন বিভাগের কোনো গাড়ি দেখলেই তারা মোবাইল ফোনে খবর পৌঁছে দেয়। এতে অভিযানের আগেই শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে করেরহাট রেঞ্জ কার্যালয়ের এক বন কর্মকর্তা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কিছু বনকর্মী বালু লুটেরাদের সঙ্গে জড়িত। তারা অভিযানের তথ্য আগেই ফাঁস করে দেন। ফলে অধিকাংশ সময়ই কাউকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয় না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝিলতলীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের নেতৃত্ব দেন করেরহাট ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার। আর চিকনছড়ায় এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন মাসুদ ওরফে মাসুদ কালা।

যোগাযোগ করা হলে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন আনোয়ার।

ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এখানে শতাধিক মানুষ বালু তোলে। আমিও কয়েক ট্রাক বালু তুলেছি। সবাই যদি অপরাধী হয়, তাহলে আমিও অপরাধী।’

অভিযুক্ত মাসুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সহকারী বন সংরক্ষক মাহদি হাসান বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা অল্প সময়ের মধ্যেই আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর আবারও অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িয়ে পড়েন। এ কারণেই বারবার অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হচ্ছে না।’

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি ট্রাকে প্রায় ৩০০ ঘনফুট বালু থাকে। বালুর মান ও গন্তব্যভেদে প্রতিটি ট্রাকের বালু ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। উত্তোলিত বালুর বড় অংশ মীরসরাই, ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ড উপজেলার বিভিন্ন নির্মাণকাজে সরবরাহ করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বনপ্রহরী অভিযোগ করেন, করেরহাট রেঞ্জের চেকপোস্ট দিয়েই প্রতিটি বালুবাহী ট্রাককে যেতে হয়। কারণ বিকল্প কোনো সড়ক নেই। চেকপোস্ট পার হওয়ার সময় দায়িত্বরতদের ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে ঘুষ দেওয়া হয়।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন করেরহাট রেঞ্জ চেকপোস্টের ইনচার্জ ও বন কর্মকর্তা আলাল উদ্দিন।

ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘টাকার নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।’

অবৈধ বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী রিতু পারভীন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কাদের নেতৃত্বে বালু উত্তোলন হচ্ছে, কোথায় এই বালু যাচ্ছে এবং কারা তা কিনছে—পুরো চক্রটিকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক কামাল হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বনের ছড়াগুলো শুধু পানি প্রবাহের পথ নয়, এগুলো উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একবার এসব ছড়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পুরো বনজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়ে।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments