Thursday, July 23, 2026
Homeঅপরাধ‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, শিশুদের জন্য একটু ভাত চাই’

‘আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, শিশুদের জন্য একটু ভাত চাই’

বন্যার পানি বাড়তে থাকায় বান্দরবানের লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ার বাসিন্দা ম্রাসংচিং ও ক্রইংসাংপ্রু মারমাসহ অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার পাশের একটি পাহাড়ের বনে আশ্রয় নিয়েছে। টানা তিন দিন ধরে ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সেখানেই রাত কাটাচ্ছেন তারা। সঙ্গে আনা শুকনো খাবার শেষ হয়ে গেছে। ঘরে ফেলে আসা চাল, কাপড় ও আসবাবপত্রের কোনোটিই আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তাদের একটাই আবেদন—‘আমাদের তেমন কিছু দরকার নেই। শুধু একটু চাল বা ভাত পেলেই হবে। আমরা না খেয়ে থাকতে পারব, কিন্তু আমাদের শিশুদের অন্তত খাবার দিতে হবে।’

শুধু লেমুঝিড়ি নয়, বান্দরবানের বিভিন্ন দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাতেও একই চিত্র।

প্রশাসনের সহায়তা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছালেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অনেক পাহাড়ি এলাকায় এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ পাহাড় ও বনের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের।

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়কে পানি উঠে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, বান্দরবান পৌর এলাকার হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, ক্যংচিংঘাটা, বালাঘাটা, বরিশালপাড়া, মারমা বাজার নদীপাড়, কাশেমপাড়া, মেম্বারপাড়া ও লেমুঝিড়িসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল কোমর থেকে কোথাও কোথাও গলা সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে হাজারো মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা পাশের পাহাড় ও বনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

লেমুঝিড়ি মারমা পাড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবারের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

ম্রাসংচিং মারমা ও ক্রইংসাংপ্রু মারমা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, প্রায় তিন দিন ধরে আমরা পানিবন্দি। পাড়ার পাশে পাহাড় ও বনে আশ্রয় নিয়েছি। অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পারিনি। কেউ অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, আবার কেউ শিশুদের নিয়ে পাহাড়ের বনে কোনোমতে রাত কাটাচ্ছে। আমাদের হাতে থাকা শুকনো খাবারও শেষ হয়ে গেছে। এখনো কেউ সহযোগিতা করতে আসেনি।’

এদিকে, জেলা শহরের বালাঘাটা এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে নৌকায় করে মানুষ পারাপার করছেন। কেউ ভ্যানে, আবার কেউ কোমর সমান পানি পেরিয়ে হেঁটে চলাচল করছেন। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে গিয়ে স্বাভাবিক সময়ের ১০ টাকার ভাড়া এখন ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

বালাঘাটা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ কালাম ডেইলি স্টার বলেন, সাধারণ সময়ে টমটমে শহরে যেতে ১০ টাকা লাগে। এখন অর্ধেক পথ যেতে ১০০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। কয়েকদিন ধরে মানুষের যে দুর্ভোগ চলছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, ভ্যান বা নৌকার ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় কোমর সমান পানি পেরিয়ে বাজারে যেতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বালাঘাটা আমবাগানপাড়া এলাকার বাসিন্দা উমং প্রু মারমা বলেন, আজ অসুস্থ এক স্বজনকে নিয়ে বান্দরবান সদরে যেতে হয়েছিল। কিন্তু সড়কে পানি জমে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লেগেছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতি বছরই এই এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা হলে এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলায় ৪৬টি, রুমায় ২৮টি, রোয়াংছড়িতে ১৯টি, থানচিতে ১৫টি, আলীকদমে ১৫টি, লামায় ৫৫টি এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে ৪২টিসহ মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত শুধু বান্দরবান সদরের ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে অন্যান্য উপজেলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী অপু দেব ডেইলি স্টারকে বলেন, মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৮০ মিটার। তবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত নদীটির পানি ১৩ দশমিক ৪৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে সাঙ্গু নদীর পানিও ১৪ দশমিক ৮০ মিটার বিপৎসীমা অতিক্রম করে ১৫ দশমিক ৫৫ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের অফিসার ইনচার্জ কুমার মণ্ডল ডেইলি স্টারকে বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা অতি ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ৫ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৯ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত ৯৬ ঘণ্টায় মোট ৭৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মমতা আফরিন বলেন, বন্যায় কবলিত বম হোস্টেল ও ত্রিপুরা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে এবং পানিবন্দি অন্যান্য মানুষের কাছেও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস ডেইলি স্টারকে বলেন, পাহাড়ধস ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জেলার সাতটি উপজেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। তবে দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়া মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments