Wednesday, July 22, 2026
Homeইরানের ১৪০ লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, ৫ দেশের মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা তেহরানের

ইরানের ১৪০ লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, ৫ দেশের মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা তেহরানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জেরে তেহরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে।

এএফপি ও আল জাজিরার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। একইসঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

১৪০ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলা

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।

সেন্টকমের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার, সামরিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার সক্ষমতা কমিয়ে আনতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হবে।’

বুশেহরের ৫ শহর আক্রান্ত

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর প্রদেশের অন্তত পাঁচটি শহর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। শহরগুলো হলো আসালুইয়েহ, দেইর, বুশেহর, দাশতি ও তানগেস্তান।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, চলতি সপ্তাহে একই প্রদেশে বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকাও হামলার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন। 

তবে এসব দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো মন্তব্য করেনি।

দ্বিতীয় জাহাজে হামলার দাবি আইআরজিসির

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে দ্বিতীয় একটি জাহাজেও হামলা চালানো হয়েছে।

এর আগে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। আইআরজিসির দাবি, জাহাজটি অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার না করায় তাকে থামাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এটি ছিল আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলরত একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অযৌক্তিক হামলা।

জাহাজে আগুন, পরে নাবিকদের উদ্ধার

মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, হামলায় কনটেইনার জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জাহাজে আগুন ধরে যায়। একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলেও তারা দাবি করেছে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, ওমান উপকূলের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির সব নাবিক লাইফবোটে করে জাহাজ ত্যাগ করেন। পরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিরাপদে উদ্ধার করে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা

জাহাজে হামলার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড ঘোষণা দেয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এবং এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই রুট বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

উপসাগরীয় ৫ দেশে ইরানের পাল্টা হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং রাডার স্থাপনায় পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি।

কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করেছে। হামলার সময় বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ এবং সাইরেন বাজতে শোনা যায়।

কাতারে আহত তিনজন

কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী ও সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন।

পাল্টাপাল্টি হুমকি উত্তেজনা বাড়াচ্ছে

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বার্তায় প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধ জাতির ইচ্ছা এবং তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।’

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সতর্ক করে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হামলার চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করে দেবে।

কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত

যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হলেও কূটনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়নি। ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা জোরদার করতে কাতারের একটি প্রতিনিধি দল তেহরান সফর করছে।

তবে উভয় পক্ষের সামরিক অভিযান এবং পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতির অবনতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments