Friday, May 1, 2026
Homeখেলাঈশ্বরের হাত নাকি শয়তানের থাবা?

ঈশ্বরের হাত নাকি শয়তানের থাবা?

আফ্রিকা মহাদেশে প্রথম বিশ্বকাপ দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। ভুভুজেলার ঝাঁঝাল শব্দ আর আফ্রিকান সমর্থকদের নিজস্ব ঘরানার ঝলমলে উদযাপনে মাতোয়ারা ছিল বিশ্ব। টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে এসে ঘানা ছিল আফ্রিকার একমাত্র বেঁচে থাকা আশা। ২০১০ সালের ২ জুলাই জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে ঘানা বনাম উরুগুয়ের ম্যাচটি ছিল ইতিহাস গড়ার মঞ্চ।

আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার হাতছানি ছিল ব্ল্যাক স্টার্সদের সামনে। একটি গোটা মহাদেশের প্রায় শত বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার ভার ওই রাতে তাই চেপেছিল আসামোয়াহ জিয়ান, সুলি মুনতারি, কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেংদের কাঁধে। গ্যালারি শুধু ঘানার পতাকায় নয়, সেজেছিল পুরো আফ্রিকার রঙে। এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক মহাদেশীয় স্বপ্নের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

তবে ম্যাচটি ইতিহাস গড়ার সম্ভাবনা এবং প্রবল স্নায়ুচাপের কারণে যতটা স্মরণীয় হতে পারত, তার চেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে এর ভেতরের নাটকীয়তার জন্য— যার কেন্দ্রে ছিলেন উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ।

প্রথমার্ধের একেবারে শেষ মুহূর্তে মুনতারি প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে নেওয়া জোরালো শটে ঘানাকে এগিয়ে দেন। ওই বিশ্বকাপে ব্যবহৃত কুখ্যাত ‘জাবুলানি’ বলের অপ্রত্যাশিত বাঁক উরুগুয়ের গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরাকে পরাস্ত করে। বিরতির পর উরুগুয়েও সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ার্ধের দশম মিনিটে দিয়েগো ফোরলান একটি ট্রেডমার্ক ফ্রি-কিক থেকে গোল করে স্কোরলাইন ১-১ করেন। বাতাসে ভয়ঙ্করভাবে দিক পরিবর্তন করা বলটি ঘানার গোলরক্ষক রিচার্ড কিংসনকে পুরোপুরি বোকা বানায়।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ঘানাই মাঠে তুলনামূলক বেশি দাপট দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার গৌরব হয়তো তাদের ভাগ্যেই লেখা আছে।

ম্যাচের বয়স তখন ১২০ মিনিট। পর্তুগিজ রেফারি ওলেগারিও বেনকেরেঙ্কা যেকোনো সময় শেষ বাঁশি বাজাবেন। ডান প্রান্তে একটি ফ্রি-কিক পায় ঘানা, যা নিশ্চিতভাবেই ছিল ম্যাচের একেবারে শেষ আক্রমণ। আর দেখা মেলে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা রুদ্ধশ্বাস কয়েকটি সেকেন্ডের।

জন পেইন্টসিলের নেওয়া ফ্রি-কিক ডি-বক্সে গেলে হেড করেন বোয়াটেং। মুসলেরা এগিয়ে এসে পাঞ্চ করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। আলগা বল চলে যায় স্টিফেন আপিয়ার কাছে। ছয় গজের বক্সের ভেতর থেকে তিনি জোরালো শট নেন, কিন্তু গোললাইনে দাঁড়িয়ে নিজের হাঁটু দিয়ে ব্লক করেন সুয়ারেজ। মাটিতে ড্রপ খেয়ে হাওয়ায় ভাসতে থাকা বলে ছুটে এসে দারুণ একটি হেড করেন ডমিনিক আদিয়াহ। উরুগুয়ের দিয়েগো ফুসিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা আটকানোর চেষ্টা করে পারেননি। ঠিক পেছনে তখনও গোললাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুয়ারেজ। বল যখন নিশ্চিতভাবেই জালে জড়াচ্ছে, ঠিক তখনই একজন গোলরক্ষকের মতো লাফিয়ে উঠে দুই হাত দিয়ে তা ঠেকিয়ে দেন তিনি। এটি ছিল নিজের দলকে বাঁচানোর জন্য তার অত্যন্ত মরিয়া প্রচেষ্টা।

গ্যালারি থেকে মনে হচ্ছিল, বল যেন দ্রুতগতিতে কেবল এদিক-ওদিক যাচ্ছে। তবে মুহূর্তের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, লাইন্সম্যান পতাকা তুলেছেন এবং রেফারির বাঁশি বেজেছে। পর্তুগিজ রেফারি যখন উরুগুয়ের ডি-বক্সের দিকে হেঁটে আসছিলেন, তার হাতে লাল কার্ড দেখা যায়। এর অর্থ কেবল দুটি— হ্যান্ডবল ও পেনাল্টি। সুয়ারেজকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়তে বলা হয়। তিনি কিছুটা সময় নষ্ট করার চেষ্টা করলেও ফিফার এক কর্মকর্তা তার হাত ধরে মাঠের বাইরে নিয়ে যান।

নাটকীয়তার শেষ নয় সেখানেই। টানেলের ভেতরে ঢোকার মুখের ফুটেজে দেখা যায়, একরাশ বিষণ্ণতা নিয়ে সুয়ারেজ জার্সিতে মুখ ঢেকে তাকিয়ে আছেন মাঠের দিকে। ঠিক তখনই জিয়ানের নেওয়া পেনাল্টিটি ক্রসবারে লেগে বাইরে চলে যায়। আর এই দৃশ্য দেখে বিষাদের খোলস ছেড়ে সুয়ারেজ বুনো উল্লাসে ফেটে পড়েন।

জিয়ানের পেনাল্টি মিস শুধু সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা ছিল না, এটি ছিল ঘানার মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মুহূর্ত। ট্রমা আর হতাশা নিয়ে টাইব্রেকারে যাওয়া দলটি স্নায়ুচাপ ধরে রাখতে পারেনি। অন্যদিকে, উরুগুয়ের পক্ষে সেবাস্তিয়ান আব্রেউ এক অবিশ্বাস্য পানেনকা শটে গোল করে দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে যান। জোহানেসবার্গ স্তব্ধ হয়ে যায়। একটি মহাদেশের হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

সুয়ারেজ তার কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত ছিলেন না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের গোলটির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছিলেন, ‘আসল “হ্যান্ড অব গড” এখন আমার। আমি টুর্নামেন্টের সেরা সেভটি করেছি। অনুশীলনে মাঝেমধ্যে আমি গোলরক্ষক হিসেবে খেলি, তাই আমার এই চেষ্টা সার্থক হয়েছে। আমার সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। তারা যখন পেনাল্টি মিস করল, আমার মনে হলো, “এটি একটি অলৌকিক ঘটনা এবং আমরা টুর্নামেন্টে টিকে আছি।” আমরা এখন সেমিফাইনালে, যদিও লাল কার্ড পাওয়ায় আমি কষ্ট পেয়েছি।’

ঘানাসহ পুরো আফ্রিকায় সুয়ারেজ পরিণত হন খলনায়কে— যিনি একটি মহাদেশের কাছ থেকে তাদের ন্যায্য ইতিহাস ছিনতাই করেছেন। বিপরীতে, উরুগুয়েতে তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর। সেখানে তাকে এমন একজন হিসেবে দেখা হয়, যিনি দলের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, নিশ্চিত লাল কার্ড ও নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়ে দেশের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ফোরলানও সুয়ারেজের প্রশংসায় বলেছিলেন, ‘সেমিফাইনালে তাকে না পাওয়াটা দুঃখজনক, কিন্তু সে দারুণ একটি সেভ করেছে। সে গোল করেনি, কিন্তু একটি গোল বাঁচিয়েছে। সে লাল কার্ড পেয়েছে, কিন্তু আমাদের জন্য ম্যাচটি বাঁচিয়ে দিয়েছে।’

ওই ঘটনা ফুটবল দুনিয়াকে দুটি পরিষ্কার ভাগে বিভক্ত করে দেয়। নৈতিকতার জায়গা থেকে প্রশ্ন ওঠে— এটি অন্যায় নাকি পেশাদারিত্বের চরম রূপ? সুয়ারেজের যুক্তি ছিল, তিনি নিয়ম ভেঙেছেন এবং রেফারি তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে শাস্তি দিয়েছেন এবং পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়েছেন। তবে ঘানা যেহেতু পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার সম্পূর্ণ দায় তাদের।

তখনকার ২৩ বছর বয়সী আয়াক্স আমস্টারডামের খেলোয়াড় সুয়ারেজের ক্যারিয়ারে এটিই ছিল প্রথম বড় কোনো বৈশ্বিক বিতর্ক। পরবর্তীতে ২০১০ সালের শেষদিকে পিএসভি আইন্দহোফেনের ওটমান বাক্কালকে কামড়ানো, ২০১৩ সালে লিভারপুলের হয়ে খেলার সময় চেলসির ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচকে কামড়ানো এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালির জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড়ানোর ঘটনাগুলো তার ক্যারিয়ারকে আরও বিতর্কের মুখে ফেলে। মাঝে ২০১১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্যাট্রিস এভরাকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদী মন্তব্যের দায়েও তিনি নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

তবে ঘানার মানুষের ক্ষোভ এক যুগেও প্রশমিত হয়নি। সবশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে আবার মুখোমুখি হয় এই দুই দল। ম্যাচের আগে এক ঘানাইয়ান সাংবাদিক সুয়ারেজকে সরাসরি ‘এল দিয়াবলো’ বা ‘শয়তান’ বলে সম্বোধন করেন এবং দাবি করেন, দেশটির মানুষ তাকে এই নামেই ডাকে।

সেই সাংবাদিক ক্ষমা চাইতে বললে সুয়ারেজের উত্তর ছিল একেবারে স্পষ্ট, ‘আমি এর জন্য ক্ষমা চাইব না। আমি হ্যান্ডবল করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু পেনাল্টি তো মিস করেছে ঘানার খেলোয়াড়। আমি নই। আমি হয়তো ক্ষমা চাইতাম যদি কোনো বাজে ট্যাকল করে কাউকে চোটে ফেলতাম এবং লাল কার্ড পেতাম। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমি লাল কার্ড দেখেছি এবং রেফারি পেনাল্টি দিয়েছেন। ঘানার খেলোয়াড় নিজে বলেছে যে, সেও একই কাজ করত। তাই এটি কোনোভাবেই আমার দায় নয়।’

ম্যাচটিতে উরুগুয়ে ২-০ গোলে জয়লাভ করে। কিন্তু ৬৫তম মিনিটে এদিনসন কাভানির বদলি হিসেবে মাঠ ছাড়ার পর সুয়ারেজ বেঞ্চে বসে অবিশ্বাস্য এক খবর পান। দক্ষিণ কোরিয়া শেষ মুহূর্তের গোলে পর্তুগালকে হারিয়ে দিয়েছে। ফলে উরুগুয়ে জিতলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। ম্যাচ শেষে মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুয়ারেজ। ঘানার মানুষ হয়তো এটিকে এক যুগ আগের সেই দগদগে ক্ষতে কিছুটা হলেও প্রলেপ হিসেবে দেখেছিল।

১৭ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৪২ ম্যাচে ৬৯ গোল করে ২০২৪ সালের শেষদিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান সুয়ারেজ। তার ক্যারিয়ার ট্রফি, গোল আর দারুণ সব ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জনে ভরপুর থাকলেও গোটা আফ্রিকার মহাদেশের কাছে তিনি চিরকাল বিতর্কিত এক চরিত্র হয়েই থাকবেন।

একটি ত্বরিত সিদ্ধান্ত, একটি মরিয়া লাফ ও দুটি হাতের ব্যবহার— সুয়ারেজকে ফুটবল ইতিহাসের এমন জায়গায় স্থান দিয়েছে, যেখানে তিনি একই সঙ্গে পরম পূজনীয় ত্রাতা এবং চরম ঘৃণিত খলনায়ক।
 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments