Friday, July 24, 2026
Homeঅপরাধএমপিকে ডেকে সড়কের কাজ ‘উদ্বোধন’, পরে ইট তুলে নেওয়ায় ভোগান্তি

এমপিকে ডেকে সড়কের কাজ ‘উদ্বোধন’, পরে ইট তুলে নেওয়ায় ভোগান্তি

ইট বিছানো গ্রামীণ সড়ক পাকা করার কথা বলে আয়োজন করা হয়েছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ঘটা করে উদ্বোধনও করা হয়। কিন্তু পরদিন থেকেই সড়ক থেকে একে একে তুলে নেওয়া হয় সব ইট। এরপর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও শুরু হয়নি কোনো নির্মাণকাজ।

পরে খোঁজ নিয়ে স্থানীয়রা জানতে পারেন, সড়ক পাকা করার কোনো প্রকল্পই নেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রতারণার মাধ্যমে সড়কের ইট তুলে নিয়ে গেছে একটি চক্র। একই কায়দায় অন্য একটি সড়কের ইট তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে স্থানীয়রা ওই চক্রের সদস্যদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন।

ঘটনাটি জামালপুর সদর উপজেলার রশীদপুর ইউনিয়নের। ওই ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের ইট তুলে নেওয়ায় আশপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগে পাকুল্যা ভাঙ্গুনি ঘাট থেকে গজারিআটা ভাঙা ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এবং ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল। এতে গজারিআটা, গোপীনাথপুর, হাটুভাঙ্গা, ডুয়াইলপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছিল।

গত মে মাসে ওই সড়ক পাকা করার কথা বলে একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্থানীয়দের জানানো হয়, চার কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক নির্মাণের কাজ পেয়েছে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় আবদুল মান্নান নামে এক ব্যক্তি সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি। কিন্তু অনুষ্ঠানের পরদিন থেকেই আবদুল মান্নানের লোকজন সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিভিন্ন যানবাহনে করে অন্যত্র সরিয়ে নিতে শুরু করে বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী।

পরে স্থানীয়রা এলজিইডির কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই সড়কের জন্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়নি এবং কোনো দরপত্রও হয়নি।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, ইট তুলে নেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আমেছ আলীর ছেলে আবদুল মান্নান (৫০)। দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকার পর এলাকায় ফিরে তিনি নিজেকে ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন।

সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের ইট সরিয়ে নেওয়ার পর একই কৌশলে সদর উপজেলার চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে গত ১৬ জুন স্থানীয়রা আবদুল মান্নানসহ তার সহযোগীদের আটক করে পুলিশে দেন।

জামালপুরের নারায়ণপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক মো. মঞ্জুরুল খান জানান, চাঁদপুর এলাকায় ইট তুলে নেওয়ার সময় এলাকাবাসী চক্রটির ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে তারা জামিনে আছেন। ঘটনার তদন্ত চলছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত সড়কের কোথাও একটি ইটও নেই। পুরো সড়কজুড়ে কাদা ও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যাচ্ছে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ কোনো যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছে না। অনেকেই জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে কাদা মাড়িয়ে চলাচল করছেন।

সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষকেরা উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতেও ভোগান্তি বেড়েছে। জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

গজারিআটা গ্রামের রফিক মিয়া বলেন, কয়েক মাস আগেও এই সড়ক দিয়ে সহজে চলাচল করা যেত। এখন কাদা ও গর্তের কারণে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্ষায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, সড়কের খারাপ অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে না পারায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত সড়কটি পাকা করা সম্ভব না হলে অন্তত আগের মতো ইট বিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় শিক্ষার্থী শাকিল, রুকন ও কমল মিয়া জানায়, যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় তাদের দীর্ঘ পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগছে।

রশীদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য জামিল হাসান বলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ও এলাকার অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকায় তারা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেননি।

তবে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রুহুল আমিন বলেন, সংসদ সদস্যের যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তখন বিষয়টি প্রতারণা বলে বোঝা যায়নি।

সড়ক পাকা করার কথিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন)।

তিনি বলেন, তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাননি, তবে সড়ক দেখতে গিয়েছিলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই সড়কের জন্য কোনো প্রকল্প বা দরপত্র হয়নি। এরপর দলীয় নেতা-কর্মীদের সহযোগিতায় অভিযুক্তদের আটক করে পুলিশের কাছে দেওয়া হয়।

জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার বলেন, উদ্বোধনের বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সেখানে কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি। তবে মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় সড়কগুলো মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এলজিইডির জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বলেন, সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। বর্তমানে ওই সড়কগুলোর কোনো উন্নয়ন প্রকল্প চলমান নেই। তবে মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments