Friday, October 23, 2026
Homeঅপরাধকরোনাকালে কার্গো ফ্লাইটের ৮৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ বিমান

করোনাকালে কার্গো ফ্লাইটের ৮৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থ বিমান

করোনা মহামারির সময় ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইট থেকে প্রায় ৮৮৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে  বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।

মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলে অলস পড়ে থাকা উড়োজাহাজকে কার্গো পরিবহনে ব্যবহার শুরু করে বিমান। তখন এই ফ্লাইটগুলোকে আয় ধরে রাখার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু পরে তা আর্থিক দায়ে পরিণত হয়।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, এসব ফ্লাইটের চুক্তি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় ও আর্থিক তদারকিতে গুরুতর দুর্বলতা ছিল। কোথাও চুক্তিতে অসঙ্গতি, কোথাও ইনভয়েস না থাকা, আবার কোথাও আয় হিসাবভুক্ত না করা ও জরিমানা মওকুফের তথ্য পাওয়া গেছে।

মহামারির সময়ে বিদেশি সরকারের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনাও বিমান পেয়েছিল কি না, তার প্রমাণও মেলেনি।

সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে চীনের গুয়াংজু রুটে।

২০২৫ সালের ১৯ মে তারিখের একটি সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গুয়াংজুভিত্তিক পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান সুপারপাওয়ার লজিস্টিকস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে একই ফ্লাইটের জন্য দুটি চুক্তি করা হয়েছিল।

বিমানের কাছে থাকা একটি চুক্তিতে প্রতি ফ্লাইটের চার্টার ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৭৬ হাজার ডলার (প্রায় ৯৪ লাখ টাকা)। অন্যদিকে, সুপারপাওয়ারের হাতে থাকা চুক্তিতে একই ফ্লাইটের ভাড়া ছিল ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা)।

দ্য ডেইলি স্টার দুটি চুক্তিই পর্যালোচনা করেছে। এগুলো ২০২১ সালের ১৩ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে পরিচালিত নয়টি ফ্লাইটের জন্য করা হয়েছিল। একই মাসে কয়েক দিনের ব্যবধানে চুক্তিগুলো সই হয়।

বিমানের কাছে থাকা চুক্তিপত্রে তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) দিলীপ কুমার চৌধুরীর সই থাকলেও সুপারপাওয়ারের কপিতে অন্য একটি সই ছিল।

তদন্তকারীরা এটিকে ‘গুরুতর রাজস্ব ফাঁসের’ প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপারপাওয়ার যে চুক্তিতে সই করেছিল, বিমান তাতে সই করেনি। আবার বিমানের করা চুক্তিতে সুপারপাওয়ার সই করেনি। অথচ দুই পক্ষই নিজেদের চুক্তিকে আনুষ্ঠানিক নথি হিসেবে ব্যবহার করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিমানের কাছে থাকা চুক্তিতে সুপারপাওয়ারের সইয়ের অংশটি ডিজিটালমাধ্যম ব্যবহার করে কেটে বসানো হয়েছিল। দুই পক্ষের কাছে থাকা চুক্তি একই হওয়ার কথা থাকলেও তা ছিল না।

তদন্তকারীদের সিদ্ধান্ত, সুপারপাওয়ার প্রতি ফ্লাইটে ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা) দিলেও বিমান পেয়েছে মাত্র ৭৬ হাজার ডলার (প্রায় ৯৪ লাখ টাকা)।

ইমেইলে সুপারপাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও গতকাল পর্যন্ত তারা কোনো জবাব দেয়নি।

সাবেক জিএম দিলীপ কুমার চৌধুরী বলেন, ঘটনাটি অনেক আগের হওয়ায় বিস্তারিত তার মনে নেই এবং এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না।

শুধু চুক্তিতে থাকা অর্থের অসঙ্গতিই নয়, বিমানের নিজের হিসাবে থাকা রাজস্বও পুরোপুরি আদায় করা হয়নি।

গুয়াংজু রুটের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই রুটের কার্গো ফ্লাইট থেকে বিমান প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার (প্রায় ১৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা) আদায় করেছে। কিন্তু বিমানের নিজের চুক্তিতে প্রতি ফ্লাইটের ভাড়া ৭৬ হাজার ডলার (প্রায় ৯৪ লাখ টাকা) ধরা হলেও মোট আয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ ডলার (প্রায় ২০১ কোটি ৭২ লাখ টাকা)।

অর্থাৎ বিমানের নিজস্ব চুক্তির হিসাবেও ৩৩ লাখ ডলার (প্রায় ৪০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা) আদায় হয়নি। আর সুপারপাওয়ারের চুক্তির ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা) হারে হিসাব করলে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১৩ গুণ বেশি।

তদন্তকারীরা বলেন, লেনদেনের চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এবং সব ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের নথি না থাকায় পুরো অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ঠিকমতো ইনভয়েসও দেওয়া হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিমান নন-শিডিউলড কার্গো চার্টার ফ্লাইটের জন্য কোনো ইনভয়েসই দেয়নি।’

আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন রুটে একই ধরনের সমস্যা পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা-হংকং রুটে বিমান ২৩০টি নন-শিডিউলড কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করলেও মাত্র ৩৩টির রাজস্বের নথি পাওয়া গেছে।

নথিভুক্ত ফ্লাইটগুলো থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৩১ লাখ ২০ হাজার ডলার (প্রায় ৩৮ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা)। গড়ে প্রতি ফ্লাইটে এই পরিমাণ আয় ধরে তদন্তকারীরা হিসাব করেন, মোট আয় ২ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি হওয়ার কথা (প্রায় ২৬৭ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা)।

রাজস্ব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আবু সাঈদ মো. মনজুর ইমাম ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিবেদনটি জমা দেন।

চীনগামী দুটি রুটেও বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায়। ঢাকা-গুয়াংজু ও ঢাকা-উহান রুটে মোট ২১২টি ফ্লাইট পরিচালিত হলেও তদন্তকারীরা মাত্র ৯০টির নথি পেয়েছেন।

উপলব্ধ নথি অনুযায়ী এসব ফ্লাইট থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ৮৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার (প্রায় ১০২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা)। তবে তদন্তকারীদের হিসাবে প্রকৃত আয় এর দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।

গুয়াংজু রুটের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্গো থেকে আয় হিসাব রাখার জন্য গঠিত ‘চার্টার সেল’ও এসব কার্যক্রম ঠিকভাবে হিসাবভুক্ত করতে পারেনি। ফলে রাজস্বের হিসাব, বাজেট নথি ও ফ্লাইট পরিচালনার প্রতিবেদনে অসঙ্গতি তৈরি হয়।

ব্যাংকক রুটেও একই ধরনের হিসাবের ঘাটতি পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের ১০ নভেম্বরের রাজস্ব বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা-ব্যাংকক রুটে বিমান ৮৫টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। কিন্তু ফ্লাইটের তথ্য ও রাজস্ব বিবরণীর মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ৮৫টি চার্টার্ড ফ্লাইটের আয় ঠিকভাবে হিসাবের খাতায় না রাখায় ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা বিমানের হিসাবের বাইরে থেকে যায় বা আদায় করা হয়নি।

এছাড়া ২০টি ফ্লাইটের চুক্তিও তদন্তকারীরা খুঁজে পাননি। ফলে এসব ফ্লাইট থেকে কত আয় হওয়ার কথা ছিল বা কত আয় হারিয়েছে বিমান, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

একই ব্যাংকক রুটে পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য নিয়মিত হারের অর্ধেক রাজস্ব নেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বরের একটি অডিট নথিতে বলা হয়, ঢাকা বিমানবন্দরে নন-শিডিউলড কার্গো হ্যান্ডলিং ও টার্মিনাল হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বিমানের সাধারণ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৫ সেন্ট (প্রায় ১৮ টাকা ৪৫ পয়সা)। কিন্তু এসব চার্টার্ড ফ্লাইটের ক্ষেত্রে তা কমিয়ে ৭ সেন্ট (প্রায় ৮ টাকা ৬১ পয়সা) করা হয়েছিল।

৩ হাজার ৩৮৩ টন কার্গোর ক্ষেত্রে এই কম হারের কারণে বিমানের সম্ভাব্য আয় প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার টাকা) কমে যায়।

গুয়াংজু রুটে ১৫২টি ফ্লাইট বাতিল হলেও চুক্তি অনুযায়ী বিমান সেসব ফ্লাইটের জরিমানা আদায় করেনি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেইলি স্টারের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, সাতটি বাতিল ফ্লাইটের জন্য বিমান ৩ লাখ ৭১ হাজার ২০০ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা) বাতিল ফি এবং আরও ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার (প্রায় ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫ হাজার টাকা) গ্রাউন্ড-টাইম জরিমানা পাওয়ার অধিকারী ছিল। কিন্তু এর প্রায় পুরোটা মওকুফ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আদায় করা হয় মাত্র ১৮ হাজার ৫৬০ ডলার (প্রায় ২২ লাখ ৮৩ হাজার টাকা)।

তৎকালীন বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন এসব জরিমানা মওকুফের সুপারিশ করেছিলেন। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল আজিম তা অনুমোদন করেন।

সালাহউদ্দিন তার সুপারিশে বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি, লকডাউন ও ছুটির কারণে ফ্লাইটগুলো বাতিল হয়েছিল।

তবে চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা ছিল, ফ্লাইটের ৪৮ ঘণ্টা আগে বাতিল করা হলে চুক্তিমূল্যের ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত হবে।

বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত শফিউল আজিম নির্দিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে মন্তব্য করতে না পারলেও দাবি করেন, সব আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল।

মহামারির সময়ে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার জন্য চীনা সরকারের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনা বিমান পেয়েছিল কি না, তারও কোনো প্রমাণ তদন্তকারীরা পাননি।

গুয়াংজু রুটের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ ও ২০২১ সালে চীনের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কার্গো পরিবহনকারীদের জন্য একটি সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছিল।

ঢাকা থেকে উহান ও গুয়াংজুতে পরিচালিত ২১২টি ফ্লাইটের জন্য দূরত্ব ও উড্ডয়নকালে সর্বোচ্চ ওজনের ভিত্তিতে বিমান প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা প্রণোদনা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই অর্থ পাওয়ার বা দাবি করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

উহানের এক পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির বরাত দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানের চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ প্রণোদনা পেয়েছিল, যা বিমানের পাওয়ার কথা ছিল।

বিমানের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, কোভিডের সময় পরিচালিত চার্টার্ড ফ্লাইট নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে। তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।

রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার কারণে বিমানের উড়োজাহাজেও কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

অডিট ও ফাইন্যান্স সাব-কমিটির অভ্যন্তরীণ নথিতে এর বিস্তারিত উঠে এসেছে।

নথিতে বলা হয়, চারটি বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট বা আইএফই ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিমান লন্ডন রুটে এসব উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে পারেনি বিমান।

২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কমিটির সপ্তম সভার নথিতে বলা হয়, ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের আসনের ওপর সরাসরি পণ্য রাখা হয়েছিল। এর ফলে মূলত আইএফই ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরের সভার একটি নথি অনুযায়ী, ১৬০টি আসন মেরামতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থ্যালেস অ্যাভিওনিকসকে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৪ ডলার (প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৫২ টাকা) পরিশোধ করা হয়।

নথিতে আরও বলা হয়, ২০২২ সালে রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের একটি কমিটি ক্ষতির বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। তখন তারা দাবি করেছিল, কার্গো পরিবহনের কারণে আইএফই ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করায় ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।

তবে বিমানের কয়েকজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, কার্গো পরিবহনের কারণে উড়োজাহাজের আসনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments