Wednesday, July 22, 2026
Homeক্যানসার চিকিৎসা: সহানুভূতি নয়, দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন

ক্যানসার চিকিৎসা: সহানুভূতি নয়, দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন

বাংলাদেশে ক্যানসার আজ শুধুমাত্র একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, বরং গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। একটি পরিবারে কারো ক্যানসার ধরা পড়লে সেই পরিবার শুধু রোগীকে বাঁচানোর লড়াইয়ে নামে না, তারা লড়াই করে আর্থিক ধ্বংস, মানসিক বিপর্যয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধেও।

সম্প্রতি সরকার ক্যানসার ও কিডনি রোগীদের জন্য বছরে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি মানবিক উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সহায়তা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ?

ক্যানসার চিকিৎসার বাস্তব চিত্র অত্যন্ত কঠিন। একটি কেমোথেরাপির খরচ অনেক ক্ষেত্রেই লাখ টাকার বেশি হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ, যার প্রতিটিই ব্যয়বহুল। এ দেশের অধিকাংশ পরিবারের জন্যই সেই খরচ প্রায় অসহনীয়। ফলে এক লাখ টাকার সহায়তা নিঃসন্দেহে সহায়ক হলেও এটি সামগ্রিক সমস্যার অতি ক্ষুদ্র অংশই সমাধান করতে পারে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, আমরা কি কেবল আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারব, নাকি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?

বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসার কেন্দ্র হিসেবে মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের নাম সবার আগে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই হাসপাতালের সেবার মান, ব্যবস্থাপনা ও সক্ষমতা দেশের বিপুল রোগীর চাহিদার তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

প্রতিদিন হাজারো রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন, যার বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের। তাদের অনেককেই রাত ২টা বা তারও আগে এসে লাইনে দাঁড়াতে হয় শুধুমাত্র একটি টিকিট পাওয়ার জন্য।

এই দীর্ঘ লাইনের পেছনে রয়েছে সীমিত জনবল, অবকাঠামোগত ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দালালচক্র, যারা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

ফলে যে সরকারি হাসপাতাল হওয়ার কথা ছিল সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠছে ভোগান্তির আরেক নাম।

যাদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তারা বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এতে একদিকে যেমন দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের স্বাস্থ্যখাতের ওপর মানুষ আস্থা হারাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে এখন সময় এসেছে বাস্তবমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যাওয়ার।

প্রথমত, মহাখালীর ক্যানসার হাসপাতালকে আধুনিক, সুসংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হবে এবং কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে, যাতে রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন না হয়।

দ্বিতীয়ত, ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসার খরচ কমানোর জন্য সরকারকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে। ডায়াগনস্টিক টেস্টগুলোর ওপর ভর্তুকি দেওয়া, বিদেশি ওষুধের ওপর শুল্ক কমানো এবং কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো চিকিৎসাকে সাশ্রয়ী করতে হবে।

তৃতীয়ত, ঢাকার বাইরে অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। এতে রোগীদের রাজধানীতে আসার চাপ কমবে এবং চিকিৎসা খানিকটা সহজলভ্য হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্যানসার চিকিৎসাকে সমন্বিত স্বাস্থ্যনীতি হিসেবে দেখতে হবে। এটি শুধুমাত্র চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত।

ক্যানসার আক্রান্তদের জন্য সরকারের এক লাখ টাকার সহায়তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু এই সংকটের গভীরতা বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, আমাদের প্রয়োজন আরও বড় চিন্তা, আরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একজন রোগী একা নয়, তার সঙ্গে লড়াই করে একটি পরিবার। সেই লড়াইয়ে রাষ্ট্র যদি শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, তাহলেই এই লড়াই কিছুটা হলেও সহজ হবে।

মো. তরিকুল ইসলাম: কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments