Wednesday, July 22, 2026
Homeঅপরাধগাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদের কী হবে? সংবিধানে যা আছে

গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদের কী হবে? সংবিধানে যা আছে

নৈতিক স্খলনের কথা উল্লেখ করে আজ বুধবার বিকেলে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে।

দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নং ধারা অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য জামায়াতের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও জামায়াতের নীতিসমূহের পরিপন্থী কাজ করেন অথবা এমন কোনো কাজ করেন যাতে জামায়াতের নৈতিক প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা জামায়াতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় তবে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।

কিন্তু কথা হলো, একই কারণে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হতে পারে কি না।

এ প্রসঙ্গে আইনজীবীরা বলছেন, একজন এমপির পদ থাকবে কি থাকবে না, তার সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন ও সংসদের স্পিকার। তবে, এক্ষেত্রে তারা সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেন।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, একজন সংসদ সদস্য তার পদে থাকবার যোগ্যতা হারাবেন যদি কোন উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন, তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হন, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন, কিংবা তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে ২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

আর ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন—তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।

তবে, ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেউ সংসদ সদস্য পদে অযোগ্য হয়েছেন কি না, কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে এমপি পদ শূন্য হবে কি না, সে বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তা শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে এবং এক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে সংবিধানে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনইজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ওই এমপির সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি থাকবে না, এটা নির্বাচন কমিশন ও স্পিকার নির্ধারণ করতে পারবেন।’

‘দল থেকে তাকে বহিষ্কার করেছে এবং বহিষ্কারের কপি ইসিতে পাঠিয়েছে। এখন ইসি আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। নৈতিক কারণ দেখিয়ে হয়তো তার সংসদ সদস্যপদ খারিজও হয়ে যেতে পারে,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘তবে, এ ঘটনায় এখনো কোনো ফৌজদারি অভিযোগ গৃহীত হয়নি এবং হলে বিচার প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২ বছর কারাদণ্ড হলে বিষয়টি সহজ। যতদূর মনে হচ্ছে এমন ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম ঘটেছে। তাই সিদ্ধান্তটার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নই।’

এর আগে, বিগত আমলে আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও ডা. মুরাদ হাসানের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

২০১৫ সালে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর একটি বিতর্কিত মন্তব্যের পর তাকে বহিষ্কার করেছিল আওয়ামী লীগ। পরে দলের পক্ষ থেকে স্পিকারকে চিঠি দিয়ে তার সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানানো হয়। স্পিকার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর পর আইনি সিদ্ধান্তের আগেই লতিফ সিদ্দিকী নিজেই সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এদিকে, ২০২১ সালে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানকে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের পর প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তিনি পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্যপদ থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট পিটিশনও দায়ের হয়। তবে, পিটিশনের বিষয়ে কোনো আদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে হাইকোর্ট বলেন, এটি সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব।

তবে, দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদে উল্লেখ না থাকা গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক।

তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সংবিধানে দল থেকে বহিষ্কারের কারণে সরাসরি এমপি পদ বাতিলের সুযোগ না রাখার আইনি ও রাজনৈতিক যুক্তি রয়েছে। যদি বহিষ্কারেই পদ যেত, তবে দলীয় হাইকমান্ড বা দলীয় নেতৃত্বের ক্ষমতা অসীম ও নিরঙ্কুশ হয়ে যেত। এমপিরা তাদের এলাকার ভোটারদের চেয়ে দলীয় প্রধানদের সন্তুষ্ট রাখতে বেশি মনোযোগ দিতেন, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারত।’

‘যেহেতু এই এমপি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেননি বা দলের বিপক্ষে ভোট দেননি, তাই আইনগতভাবে স্পিকারের কাছে ইসিতে পাঠানোর মতো আনুষ্ঠানিক কিছু নেই,’ বলেন তিনি।

শাহদীন মালিক জানান, ১৯৮০ সালের সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন অনুযায়ী, সংসদ সদস্যের পদত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে ভোটদানের ক্ষেত্রে দ্বিমত সৃষ্টি হলেই স্পিকার তা নিষ্পত্তির জন্য ইসিতে পাঠান।

সম্প্রতি এক নারীর সঙ্গে একটি হোটেল রুমে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কিছু ভিডিও প্রকাশ হয়। পরে, তিনি ওই নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করেন।

কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বৈঠকে বসে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং সেখানে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়।

এর মধ্যে, গাজী নজরুলের নিজ নির্বাচনী এলাকা শ্যামনগরে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, তার এমপি পদ বাতিল ও তাকে আইনের আওতায় নিয়ে বিচারের মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে সাতক্ষীরায়।

তবে শেষ পর্যন্ত তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করে নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সদস্যপদ বাতিল হয় না। এই বিষয়ে ইসি বা আইনজ্ঞদের বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।‘

‘গাজী নজরুল ইসলামকে দল বহিষ্কার করেছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দল থেকে বহিষ্কার করলেই সংসদ সদস্যপদ আইনগতভাবে বাতিল হয়ে যায় না। দল নির্বাচন কমিশনকে ঘটনাটি অবহিত করলেও, এখন সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদের পরিধি এবং প্রচলিত নির্বাচন আইন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে আমাদের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে,’ বলেন তিনি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments