Wednesday, July 22, 2026
Homeঅপরাধগ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে রাষ্ট্রপতির জন্য বিশেষ ছাড়

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে রাষ্ট্রপতির জন্য বিশেষ ছাড়

সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীরা নানা কাঠখড় পুড়িয়ে, নিয়মের বেড়াজাল ডিঙিয়ে নিজেদের জমা টাকা তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে এসব বিধিনিষেধ থেকে বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে থাকা তার হিসাব থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে।

গত মে মাসের শেষ দিকে করা এক আবেদনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চিকিৎসা ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখায় থাকা তার হিসাব থেকে ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমতি চান। পরে গত ১৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়।

ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম-২০২৫-এর ২১ ধারার আওতায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে স্কিমের কোনো বিধান শিথিল বা সংশোধনের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক থেকে চিকিৎসার খরচ মেটাতে অর্থ উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন। রেজল্যুশন স্কিমের আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের বিধান থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা ও অবস্থান বিবেচনায় তাকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কয়েকজনকে একই ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের নাম বা কোন কোন বিষয়কে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

রাষ্ট্রপতির (বেতন ও বিশেষাধিকার) আইন, ১৯৭৫ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশে এবং প্রয়োজনে বিদেশেও সরকারি খরচে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারী।

যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রপতিও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তিনি জানান, একজন সাধারণ গ্রাহক হিসেবেই নিজের অর্থে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির আইনের আওতায় বিনা খরচে চিকিৎসার সুবিধা শুধু রাষ্ট্রপতি এবং তার সঙ্গে বসবাসকারী ও সম্পূর্ণভাবে তার ওপর নির্ভরশীল নিকট পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য। অন্য আত্মীয়রা এই সুবিধার আওতায় পড়েন না।

রাষ্ট্রপতি জানান, তার দুই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বর্তমানে ভারতে চিকিৎসাধীন। ‘এই সংকটাপন্ন সময়ে তাদের সহায়তা করা আমার দায়িত্ব’ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

‘অগ্রাধিকার শ্রেণির বাইরে’

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের একটি। অন্য চারটি হলো এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত শরিয়াহভিত্তিক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া চলছে।

রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী, অগ্রাধিকারভিত্তিক কাঠামো অনুসারে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হয়। যেসব হিসাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা রয়েছে, সেসব আমানতকারী কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই টাকা তুলতে পারেন।

এছাড়া ক্যানসার রোগী ও ডায়ালাইসিস প্রয়োজন এমন ব্যক্তিরা আমানতের পরিমাণ বিবেচনা ছাড়াই যেকোনো অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পান।

অন্য অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শ্রেণির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি তহবিল, বহুজাতিক কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি কূটনৈতিক মিশন।

বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শুরুতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কর পরিশোধের বিষয়ে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং কর পরিশোধ করে রসিদ দেওয়ার অনুরোধ জানায়।

পরে রাষ্ট্রপতি তার হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেন। আবেদনটি রেজল্যুশন স্কিমে উল্লেখ করা কোনো অগ্রাধিকার শ্রেণির মধ্যে না পড়ায় ব্যাংক বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়।

‘বিশেষ সুবিধা’

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, রেজল্যুশন স্কিমে নির্ধারিত সীমার বেশি অর্থ উত্তোলনের অনুমতি সাধারণত মানবিক কারণ বিবেচনায় দেওয়া হয়।

ব্যাংকটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন, ডায়ালাইসিস, ক্যানসার চিকিৎসা ও বিদেশে শিক্ষার খরচের মতো জরুরি প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে। গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতি এবং কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. মোকসুদুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্রপতি এখনো অনুমোদিত অর্থ উত্তোলন করেননি।

রাষ্ট্রপতিকে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর অনেক আমানতকারী এখনো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন না। 

তাদের প্রশ্ন, সাধারণ আমানতকারীরা যেখানে রেজল্যুশন স্কিমের বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতির বিষয়টি স্কিমের মানবিক বিধানের আওতায় পড়ে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তাহলে তাকে কেন বিশেষ অনুমতি দেওয়া হলো?

মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের উপদেষ্টা ছিলেন।

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলম গ্রুপ-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য

লিখিত বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি বলেন, তার আবেদনে কর পরিশোধ বা ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না।

তিনি বলেন, ‘পারিবারিক ব্যয়, ব্যক্তিগত ব্যয়, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় এবং ঈদুল আজহা-সংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে অর্থ উত্তোলনের আবেদন করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির (বেতন ও বিশেষাধিকার) আইন ১৯৭৫ অনুযায়ী কেবল রাষ্ট্রপতি এবং তার সঙ্গে বসবাসকারী ও সম্পূর্ণভাবে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরাই বিনা খরচে চিকিৎসার সুবিধা পান; পরিবারের অন্য সদস্যরা এ সুবিধার আওতায় পড়েন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোনো ধরনের বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য বলছি, “পরিবার” শব্দটি বাংলাদেশে প্রচলিত বিস্তৃত অর্থেই ব্যবহার করেছি। দেশের অনেক সাধারণ নাগরিক ও দায়িত্বশীল বড় ভাইয়ের মতো আমিও শুধু আমার নিকট পরিবার নয়, আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছোট ভাই-বোনদেরও আমার বৃহত্তর পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করি এবং তাদের সহায়তা করি।’

রাষ্ট্রপতি জানান, তার ছোট বোন এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রী বর্তমানে ভারতের চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের একজন লিভার সিরোসিসের জটিলতায় এবং অন্যজন মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে এই সংকটময় সময়ে তাদের সহায়তা করা তার দায়িত্ব বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আজ (৮ জুলাই ২০২৬) পর্যন্ত ব্যাংক থেকে আবেদন করা অর্থের কোনো অংশই ছাড় করা হয়নি।’

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments