Wednesday, April 29, 2026
Homeআন্তর্জাতিকঘণ্টায় ৩ কোটি ডলার মুনাফা করছে তেল কোম্পানিগুলো, কার লাভ কত

ঘণ্টায় ৩ কোটি ডলার মুনাফা করছে তেল কোম্পানিগুলো, কার লাভ কত

ইরান যুদ্ধের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ আয় করে নিচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক মাসে আরামকো, গ্যাজপ্রমের মতো কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত দুই হাজার ৩০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। আর এই মুনাফা আসছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই।

আজ বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে এসব তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম মাসেই বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি তেল ও গ্যাস কোম্পানি ঘণ্টায় ৩ কোটি ডলারের বেশি ‘অতিরিক্ত’ মুনাফা করেছে। 
 

সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী—সৌদি আরবের আরামকো, রাশিয়ার গ্যাজপ্রম ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সনমোবিলের মতো কোম্পানি।

সংঘাতের জেরে মার্চে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম গড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছায়। এর ফলে এক মাসেই এসব কোম্পানি অতিরিক্ত মুনাফা করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেল-গ্যাসের সরবরাহ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগবে।

জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা রাইস্টাড এনার্জি ও গ্লোবাল উইটনেসের বরাতে গার্ডিয়ান জানায়, তেলের দাম গড়ে ১০০ ডলার থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ যুদ্ধের সুযোগে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফা প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।

সৌদি আরামকো: মুনাফার দৌঁড়ে সবার আগে রয়েছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো। ২০২৬ সাল নাগাদ তাদের বাড়তি যুদ্ধ-মুনাফা দুই হাজার ৫৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। অথচ, কোম্পানিটি কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কর্মসূচিগুলোতে বাধা দেওয়ার জন্য সমালোচিত।

রাশিয়ার ৩ কোম্পানি: গ্যাজপ্রম, রজনেফট ও লুকঅয়েল—এই তিনটি রুশ কোম্পানি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় দুই হাজার ৩৯০ কোটি ডলার বাড়তি মুনাফা করবে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পুতিনের কোষাগারে এই অর্থ জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

মার্চ মাসেই রাশিয়া তেল রপ্তানি থেকে প্রতিদিন ৮৪ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি।

মার্কিন ২ কোম্পানি: পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস কোম্পানি এক্সন মবিল এ বছর এক হাজার ১০০ কোটি ডলার এবং শেভরন ৯২০ কোটি ডলার মুনাফা করবে।

ব্রিটিশ কোম্পানি: যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি ‘শেল’ এর মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৮০ কোটি ডলার।

শুধু তেলের বাজারই নয় শেয়ারবাজারেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এক্সনমোবিলের বাজারমূল্য ১১ হাজার ৮০০ কোটি ও শেলের দাম তিন হাজার ৪০০ কোটি ডলার বেড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পেট্রোরাষ্ট্র ও শেয়ারহোল্ডারদের জন্য যুদ্ধ থেকে মুনাফা করা কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

গত অর্ধশতাব্দী ধরে তেল ও গ্যাস খাতে প্রতি বছর নিট মুনাফা গড়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালের মতো সংকটময় বছরগুলোতে এই মুনাফার পরিমাণ আরও অনেক বেশি ছিল।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বিশাল অঙ্কের মুনাফা মূলত সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই আসছে। যাতায়াত, গৃহস্থালির জন্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ বিলসহ ব্যবসার কাজে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল বা জাম্বিয়ার মতো অনেক দেশ জ্বালানি কর কমালেও তাতে শুধু রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জনসেবা খাতের ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর অতি-মুনাফায় কোনো ভাটা পড়েনি।

এ বিষয়ে তেল, গ্যাস ও খনি খাতে দুর্নীতি তদন্ত বিষয়ক বৈশ্বিক সংস্থা গ্লোবাল উইটনেসের প্রধান প্যাট্রিক গ্যালে গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সংকট মানেই তেল কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা, আর এর মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার ও রাষ্ট্র তেল-গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ না করলে এভাবে আমাদের সমস্ত ক্রয় ক্ষমতা কতিপয় ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে।’

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরল বর্তমান পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এ অবস্থায় জার্মানি, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশ কিছু দেশের অর্থমন্ত্রীরা এই ‘যুদ্ধ-মুনাফা’র ওপর বিশেষ কর আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

ইউরোপীয় কমিশনকে দেওয়া চিঠিতে তারা লিখেছেন, ‘যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে যারা ফুলে ফেঁপে উঠছে, সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে তাদের দায়ভার নেওয়া উচিত।’

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে জ্বালানির বিল মোট দুই হাজার ২০০ কোটি ইউরো বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক জ্বালানি ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘এনার্জি অ্যান্ড ক্লাইমেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ এর প্রধান জেস রালস্টন বলেন, ‘এই সংকট আবারও প্রমাণ করছে, তেল-গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্য ও বায়ুর শক্তি কোনো যুদ্ধ বা সংকীর্ণ নৌপথের ওপর নির্ভর করে না। ফলে দামের অস্থিরতাও নেই।

প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরা হয়। 
 

নবায়নযোগ্য এই প্রাকৃতিক শক্তি ব্যবহার করে মার্চ মাসে প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ডের গ্যাস আমদানি এড়িয়েছে যুক্তরাজ্য।

জলবায়ু বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইথ্রিজি’ এর জ্বালানি রূপান্তর কর্মসূচির প্রধান মারিয়া পাস্তুখোভা বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত বাড়িঘর, পরিবহন ও শিল্পখাত তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমদানিকারী দেশগুলো সংঘাত ও অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মূল্য ধাক্কার ঝুঁকিতে থাকবে।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments