টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে তলিয়ে গেছে অন্তত সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর বোরো জমি। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১১ হাজার ৬৫২ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে।’
তিনি জানান, এ বছর প্রতি হেক্টরে প্রায় সোয়া ৪ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। সে হিসাবে বন্যার পানিতে নষ্ট হওয়া ধানের মূল্য দাঁড়ায় ২১১ কোটি ৮১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। একইসঙ্গে কাটার পর শুকানোর অভাবসহ নানা কারণে নষ্ট হওয়া ধানের দাম আরও ১৩৪ কোটি ১ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত জেলায় ক্ষতি প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা হলেও এটি এখনো চূড়ান্ত হিসাব নয় বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অতিরিক্ত উপপরিচালক দ্বীপক কুমার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৬২ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বন্যার কারণে নিচু এলাকার ফসল রক্ষা করা যায়নি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলা।
কৃষকরা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে ধান কাটা ও শুকানো—দুই কাজেই বাধার মুখে পড়েছেন তারা। অনেকে ধান কাটার আগেই ফসল হারিয়েছেন। আর যারা আংশিক ধান কাটতে পেরেছেন, তারা এখন শুকাতে পারছেন না। সব মিলিয়ে ক্ষতি অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায় কৃষকরা কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন।
সুজাতপুরের শতমুখা গ্রামের কৃষক মাহফুজ উল্লাহ (৪৮) দ্য ডেইলি স্টারকে নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘জীবনে কখনো ভাবিনি এভাবে ধান কাটতে হবে। পানির নিচে জমি কোথায় আছে বোঝাই যাচ্ছে না। আন্দাজ করে ধান কাটছি।’
একই গ্রামের আরেক কৃষক শাহেদ মিয়া (৩৯) বলেন, ‘একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে খোয়াই নদীর বাঁধ উপচে পানি হাওরে ঢুকেছে। আমার প্রায় অর্ধেক জমি পানির নিচে।’
বানিয়াচং উপজেলায়ও একই দুর্দশা চলছে। অনেককেই দেখা গেছে কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন এবং নৌকায় করে নিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে কিছু কিছু এলাকায় হঠাৎ পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ধান কাটা রীতিমত কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে যেসব কৃষক আগে ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও নতুন সমস্যায় পড়েছেন। রোদের অভাবে ধান ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না। অনেকেরই ধানে ইতোমধ্যে অঙ্কুর গজাতেও শুরু করেছে, এর ফলে বাজার দরও কম হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
বানিয়াচংয়ের সুবিদপুর গ্রামের কৃষক সুরুজ আলী (৪৫) বলেন, ‘একটানা বৃষ্টির কারণে ধান কাটাই কঠিন ছিল, শুকানোরও কোনো উপায় ছিল না। গত দুই দিনে একটু রোদ উঠেছে, তাতে কিছুটা ধান শুকাতে পেরেছি।’
ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২১ হাজার কৃষকের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় ও সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। তবে বাস্তবে এই কার্যক্রম ধীরগতিতে এগুচ্ছে।
জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৯টি উপজেলায় একযোগে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কেবল বানিয়াচং উপজেলায় সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম দিন সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ২ টন ধান। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৯০ মেট্রিক টন।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জ্যোতি বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, ‘ধান ভেজা থাকায় এবং মাড়াই কাজ শেষ না হওয়ায় সংগ্রহ দেরিতে শুরু হচ্ছে।
আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে সব উপজেলায় কার্যক্রম চালু হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার শুধুমাত্র শুকনো ধান কিনছে। এ অবস্থায় টানা বৃষ্টির কারণে যারা ধান শুকাতে পারছেন না, তারা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
অন্যদিকে দাম নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরাও কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
চালের পাইকারী ব্যবসায়ী হামিদুল হক আখনজি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখন বেশি দামে ধান কেনার পর সরকার যদি সংগ্রহমূল্য কমিয়ে দেয়, তাহলে আমরা লোকসানে পড়ব।’
কৃষকদের ক্ষতি ও সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনিশ্চিত হওয়ার মূলে হাওরাঞ্চলে দুর্বল ও অস্থায়ী বাঁধকে দায়ী করেছেন হবিগঞ্জ সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের সমন্বয়ক তফাজ্জল সোহেল।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একমাত্র টেকসই বাঁধের অভাবে প্রতি বছর বন্যায় হাওরের কৃষকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।’

