Wednesday, April 29, 2026
Homeআন্তর্জাতিকট্রাম্প চাইলেই কি ইরানে পারমাণবিক হামলা করতে পারবেন?

ট্রাম্প চাইলেই কি ইরানে পারমাণবিক হামলা করতে পারবেন?

ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ইরানি সভ্যতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ভয়ানক হুমকি দিলেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন তিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, কোনো অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয়।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পরমাণু অস্ত্র যাতে কেউ কোনোভাবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, ট্রাম্প কি একক সিদ্ধান্তে ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা চালাতে পারবেন?

বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি জটিল। কারণ প্রেসিডেন্টের হাতে যেমন বিপুল সামরিক ক্ষমতা রয়েছে, তেমনি সেই ক্ষমতার ওপর রয়েছে সাংবিধানিক, আইনি, সামরিক ও আন্তর্জাতিক নানা সীমাবদ্ধতা।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত।

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন বলছে, প্রেসিডেন্ট জরুরি পরিস্থিতিতে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বা বড় আকারের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন অপরিহার্য। ফলে ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা, বিশেষ করে পারমাণবিক হামলা কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে করা হলে তা আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ দেখিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করেছেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাৎক্ষণিক হামলার স্পষ্ট প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না। তাই ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ দেখিয়ে হামলা চালালে সেটি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার রেজ্যুলেশন।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সামরিক অভিযান শুরু করলে তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয় এবং ৬০ দিনের মধ্যে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু পারমাণবিক হামলার মতো তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত এই আইনের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের হাতে ‘একক কর্তৃত্ব’ রয়েছে, অর্থাৎ তিনি একাই পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। কিন্তু এই ক্ষমতা থাকা মানেই তা বৈধ এমন নয়।

এক্সিকিউটিভ ফাংশনসের বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।

আন্তর্জাতিক আইনও এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস অনুযায়ী, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র কেবল আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালানো হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, এমনকি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও উঠতে পারে।

এদিকে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা কোনো ‘স্পষ্টত অবৈধ আদেশ’ পালন করতে বাধ্য নন। অর্থাৎ যদি পারমাণবিক হামলার নির্দেশ আন্তর্জাতিক আইন বা মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী হয়, তাহলে তা বাস্তবায়নে সামরিক পর্যায়ে বাধা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ইতিহাস দেখায়, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন।

অ্যাক্সিওস বলছে, কোরিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাক ও সিরিয়া পর্যন্ত বহু ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টরা জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক হামলা সাধারণ সামরিক হামলার মতো নয়, এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ। যদি যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে তা মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এতে শুধু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাত্ত্বিকভাবে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দিতে সক্ষম হলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা অত্যন্ত জটিল। সংবিধান, কংগ্রেস, আন্তর্জাতিক আইন, সামরিক নৈতিকতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক চাপ, সব মিলিয়ে এমন সিদ্ধান্ত সহজ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেননা মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা থাকলেও তা সীমাহীন নয়। ইরানে পারমাণবিক হামলা চালানো শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি আইনি, নৈতিক ও বৈশ্বিক প্রশ্ন, যার প্রতিটি দিকই গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments