Friday, May 1, 2026
Homeসারাদেশতেহরানে দুর্বিষহ ২০ দিন: নির্ঘুম রাত কাটে ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্কে

তেহরানে দুর্বিষহ ২০ দিন: নির্ঘুম রাত কাটে ক্ষেপণাস্ত্রের আতঙ্কে

বাবুল মিয়ার দুচোখে তখন তীব্র ভয় আর আতঙ্ক। কোনোভাবে আজকের দিনটা কাটাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে চরম চিন্তিত ছিলেন তিনি। একদিকে পরিবারের সঙ্গে তার সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ, অন্যদিকে যুদ্ধের মধ্যে মৃত্যুচিন্তা।

টানা ২০ দিন ইরানের রাজধানী তেহরানের উপকণ্ঠে বসে মৃত্যু-আতঙ্কে এমন দিন কেটেছে প্রবাসী বাবুল মিয়ার। জানতেন না, পরদিন ভোরের আলো তিনি দেখতে পাবেন কি না। চরম অনিশ্চয়তাময় জীবনের একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে পৌঁছাতে হবে।

সেই পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পাখির ঝাঁকের মতো যুদ্ধবিমান উড়ছিল। কিছুক্ষণপরপর ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসছিল। আমি ঘরের ভেতর আটকে ছিলাম। একসময় মনে হলো, এভাবে অপেক্ষা করে মরার চেয়ে জীবন বাজি রেখে দূতাবাসে যাওয়াই ভালো।’ 

বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় আজারবাইজান হয়ে গত ২১ মার্চ দেশে ফেরেন বাবুল মিয়া।

বাবুল মিয়ার বাড়ি হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পানিউমদা গ্রামে। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ওমানে পাড়ি জমান তিনি। কয়েক মাস পর সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধভাবে ইরানে প্রবেশ করেন এবং তেহরানের পার্শ্ববর্তী হাসনাবাদে একটি স্টিল কারখানায় কাজ নেন। সেখানে একটি ঘরে তারা আট-নয়জন গাদাগাদি করে থাকতেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর যৌথ বিমান হামলা শুরু করে। সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাবুল বলেন, ‘রাতের খাবার খেয়ে আমরা প্রতিদিনের মতো সেদিনও ঘুমাতে গিয়েছিলাম। ভোর পাঁচটার দিকে বিকট শব্দে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। তখন আমরা দৌড়ে বাইরে যাই। সতর্কবার্তা সাইরেন বেজে উঠে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম মহড়া চলছে। পরে জানালা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে দেখলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘সকালের মধ্যেই যুদ্ধের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আমাদের কাছে সঠিক কোনো তথ্য ছিল না। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ অসম্ভব হয়ে পড়ে।’

যোগাযোগ বন্ধ থাকায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবুল মিয়ার পরিবারের সদস্যরাও।

তেহরানের একটি স্কুলে নারকীয় হামলার বিষয়ে বলতে গিয়ে বাবুলের গলা ধরে আসে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার কাছে একটি স্কুলে হামলা হয়। অনেক শিশু মারা গিয়েছিল। তখন আমাদের কারখানার পাশেও বোমা পড়েছিল। কী করব, আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কর্তৃপক্ষেরও কোনো নির্দেশনা ছিল না।’

পরিস্থিতি ক্রমেই আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে বাবুলের জন্য। তিনি বলেন, ‘ভয় যেন আমাদের এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি দিন অনিশ্চয়তায় কাটছিল। আতঙ্কে আমরা প্রতিটি রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেহরানে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যায়।’

বাবুল বলেন, ‘সব মিলিয়ে বেঁচে থাকাও কঠিন হয়ে ওঠে। আমার কাছে তখন টাকাপয়সা ছিল না। কখনো কখনো খাওয়ার মতোও কিছু থাকত না। তার পরও কাজ চালিয়ে যেতে হতো। হামলা শুরু হলে আমরা দৌড়াতাম।’

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আরও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠে। এর মধ্যেও আশার আলো দেখতে পান বাবুল। তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে জানতে পারি, বাংলাদেশ দূতাবাস তেহরান থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাময়িকভাবে সাভেহতে স্থানান্তরিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে আবেদন করি। যেদিন আবেদন করেছিলাম, সেদিন ধার করে অনেক দিন পর পেটভরে খেয়েছিলাম।’

এর মধ্যেই ৫ মার্চ অল্প সময়ের জন্য ইন্টারনেট চালু হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন বাবুল। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে দেশে ফেরার কথা বলছিল। কিন্তু ওরা জানত না, আমার কাছে খাবার কেনার মতো টাকাও নেই।’

যুদ্ধ পরিস্থিতির ক্রমেই আরও অবনতি হয়। গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে তেহরান। বাবুল বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যাবে। ১৮ মার্চ একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আমাদের পাশের একটি পুলিশ পোস্ট ধ্বংস হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সকালে গিয়ে দেখি চারদিকে শুধু ধুলা আর ধোঁয়া উড়ছে। সেখানে কতজন মারা গেছে, জানি না। আতঙ্কে সারা রাত কেঁদেছি।’

সেদিন সকালেই বাবুলের ফোনে একটি কল আসে। জানানো হয়, দূতাবাস থেকে তাকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হবে।

সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা পরিবারের সদস্যদের জানান। বাবুল মিয়ার মেয়ে তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘হঠাৎ একদিন বাবা ফোন দিয়ে জানালেন, তিনি সুস্থ আছেন। ঈদের মধ্যেই তিনি বাড়িতে আসবেন। এটা শুনে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠি।’

এর কয়েক ঘণ্টা পর বাবুল মিয়া ও অন্য বাংলাদেশি প্রবাসীরা তেহরান ছেড়ে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে তারা সাভেহ পৌঁছান। এরপর নয়টি বাসের বহরে তারা আসতারা সীমান্তের উদ্দেশে পাড়ি জমান। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রাত ২টার দিকে তারা প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে সেখানে পৌঁছান।

সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বাবুল বলেন, ‘কোনো কম্বল ছিল না। কেউ বিশ্রামকক্ষে, কেউ খোলা আকাশের নিচে ছিল। কেউই ঘুমায়নি।’

পরদিন ভোরে সীমান্ত অতিক্রম করার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এরপর সেখান থেকে তারা বাকু বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন। ২০ মার্চ সন্ধ্যায় একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা দেশের উদ্দেশে রওনা হন এবং ২২ মার্চ ভোরে দেশে পৌঁছান।

বাবুল বলেন, ‘যখন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলাম, মনে হলো যেন নতুন এক জীবন পেলাম।’

ছয় সদস্যের পরিবারে বাবুল মিয়া একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বিদেশ থেকে তার পাঠানো টাকাতেই সংসারটি চলত। কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরে আসার স্বস্তির সঙ্গে এখন দেখা দিয়েছে আর্থিক সংকটও।

বাবুল বলেন, ‘বিদেশে থাকতে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম, কিন্তু যুদ্ধের সময় প্রায় সব শেষ হয়ে গেছে। এখন দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করার চেষ্টা করছি। প্রবাসী মন্ত্রণালয় থেকে বলেছিল আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কিছু পাইনি। সহযোগিতা পেলে অনেক উপকার হতো।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments