Friday, July 24, 2026
Homeঅপরাধদিন কাটে স্কুলে, রাত কাটে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে

দিন কাটে স্কুলে, রাত কাটে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে

রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম। একের পর এক ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের হাঁকডাক, কুলিদের ছুটোছুটি আর অসংখ্য মানুষের পদচারণায় মুখর চারপাশ। সেই কোলাহলের মাঝেই প্ল্যাটফর্মের এক কোণে বিছানো একটি ছোট্ট বিছানা।

বিছানার পাশে কয়েকটি বালিশ, কিছু হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়চোপড় আর অল্প কিছু গৃহস্থালি জিনিস। এটাই একটি পরিবারের সব সম্পদ, এটাই তাদের ঘর। সেই বিছানার এক পাশে বসে গভীর মনোযোগে বই পড়ছে আট বছরের নাঈম ইসলাম। পাশে বসে আছে তার দুই ছোট বোন— রোকাইয়া আক্তার (৬) ও সিনথিয়া আক্তার (৪)।

চারপাশের অস্থিরতা নাঈমের মনোযোগে যেন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। নিজের পড়া শেষ করে ছোট বোনকেও পড়ায় সে। প্রথম শ্রেণির এই ছোট্ট শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে দারিদ্র্যের ছাপ থাকলেও স্বপ্নগুলো বড়। পড়াশোনা করে একদিন প্রতিষ্ঠিত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখে সে।

নাঈম ও রোকাইয়া রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশের পথশিশুদের জন্য পরিচালিত ‘জুম বাংলাদেশ স্কুল’-এর শিক্ষার্থী। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তারা স্কুলটিতে ভর্তি হয়। প্রতিদিন সকাল ১০টায় স্কুলে যায়, দুপুর ২টায় ক্লাস শেষে ফিরে আসে আবার সেই স্টেশন প্ল্যাটফর্মে। কারণ, তাদের কোনো ঘর নেই, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। তাই ব্যস্ত এই প্ল্যাটফর্মই এখন তাদের শোবার ঘর, খেলার মাঠ আর জীবনসংগ্রামের ঠিকানা।

চার মাস আগেও তারা স্টেশনের পাশের মুসলিমপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকত। প্রতি মাসে এক হাজার ২০০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। কিন্তু হোটেল শ্রমিক বাবা রিপন ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের হাল ধরেন মা মা রমিছা বেগম। তিনি মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। সীমিত আয়ে ভাড়া চালানো সম্ভব না হওয়ায় একসময় ঘর ছেড়ে বাধ্য হয়ে পরিবারটির আশ্রয় হয় স্টেশন প্ল্যাটফর্মে।

নাঈম বলে, আমার আর ছোট বোনের দিন কাটে স্কুলে, আর রাত কাটে স্টেশন প্ল্যাটফর্মে। স্কুলে থাকলে খুব ভালো লাগে। সেখানে বন্ধু আছে, স্যার আছে, পড়াশোনা আছে। কিন্তু স্কুল থেকে ফিরলেই কষ্ট শুরু হয়। প্ল্যাটফর্মে সারাক্ষণ মানুষের ভিড় আর শব্দ। দিনের বেলা পড়তে পারি না। রাত ৯টার পর লোকজন কমে গেলে বই নিয়ে বসি। যতটুকু পারি নিজে নিজেই পড়ি।

একটু থেমে সে বলে, আমার খুব ইচ্ছা, পড়াশোনা করে বড় মানুষ হব। আমি শিক্ষিত হতে চাই। কিন্তু দারিদ্র্য বারবার আমাকে পিছিয়ে দেয়।

স্কুল থেকে নাঈম ও রোকাইয়া পেয়েছে স্কুল ড্রেস, জুতা, ব্যাগ ও বই। প্রতিদিন সকালে অনেক সময় না খেয়েই তারা স্কুলে যায়। তবে স্কুলে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পায়। ক্ষুধার্ত দুই শিশুর কাছে সেই খাবার শুধু পেট ভরানোর নয়, পড়াশোনার শক্তিও জোগায়।

নাঈম বলে, স্কুলটাই আমাদের সবচেয়ে শান্তির জায়গা। যদি একটা নিজের ঘর থাকত, তাহলে সেখানেও শান্তিতে পড়তে পারতাম। এখন প্ল্যাটফর্মে বসে বই খুললেই কখনো ট্রেন আসে, কখনো মানুষের ভিড় হয়। মনোযোগ ধরে রাখা খুব কঠিন। তবুও আমি হাল ছাড়তে চাই না।

ছোট বোন রোকাইয়া আক্তার এখন শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী। সরল কণ্ঠে সে বলে, স্কুলে গেলে ভালো লাগে। খাবার পাই, বই পড়ি। স্যাররা অনেক আদর করেন। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে অনেক মানুষ থাকে। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। আগে ঘরে ছিলাম, তখন অনেক ভালো ছিল।

হাসিমুখে সে আরও বলে, নাঈম ভাইয়া আমাকে সবসময় পড়তে বলে। ভাইয়া নিজেই আমাকে পড়া শেখায়। আমিও অনেক পড়াশোনা করব।

মা রমিছা বেগম বলেন, আমার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খুব আগ্রহ। নাঈম নিজের ইচ্ছায় প্রতিদিন বোনকে নিয়ে স্কুলে যায়। সংসারের কষ্ট বুঝে সে মাঝে মাঝে স্টেশনে কুলির কাজও করে। যা পায়, তা দিয়ে আমাদের সংসারে একটু হলেও সাহায্য করে।

চোখের কোণে পানি নিয়ে তিনি বলেন, ঘরের ভাড়া দিতে পারিনি, তাই বাড়িওয়ালা বের করে দিয়েছেন। এখন প্ল্যাটফর্মেই থাকছি। আবার যদি কোনোদিন সামর্থ্য হয়, তাহলে একটা ঘর ভাড়া নেব। আমার সন্তানগুলোর শুধু একটা পড়ার জায়গা চাই। আল্লাহ জানেন, আমাদের ভাগ্যে কী আছে।

বাবা রিপন ইসলাম বলেন, অসুস্থ হওয়ার পর থেকে নিয়মিত কাজ করতে পারছি না। স্ত্রী যা আয় করে, তাই দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। সুস্থ হয়ে আবার কাজ করতে পারলে প্রথমেই একটা ঘর ভাড়া নেব। আমার সন্তানরা যেন অন্তত শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের কুলি মহব্বত আলী দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটিকে দেখছেন। তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মে সবসময় এত ভিড়, এত শব্দ। তারপরও নাঈম আর তার বোনকে বই নিয়ে বসে থাকতে দেখি। এত ছোট বয়সে ওদের পড়াশোনার আগ্রহ সত্যিই অবাক করে। সুযোগ পেলে ওরা অনেক দূর যেতে পারবে।

জুম বাংলাদেশ স্কুলের প্রধান শিক্ষক আসিফ মাহমুদ বলেন, স্কুলটিতে বর্তমানে ৮৬ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু পড়াশোনা করছে। প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে বঞ্চনা ও সংগ্রামের গল্প। তবে নাঈম ও রোকাইয়ার গল্পটি আলাদা।

তিনি বলেন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসবাস করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। তবুও নাঈম প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে আসে এবং পড়াশোনার প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ। দাতাদের সহায়তায় আমরা শিশুদের স্কুল ড্রেস, জুতা, ব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ দিয়েছি। প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবারেরও ব্যবস্থা রয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই শিশুরা স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেনি।

রেলস্টেশনের সেই প্ল্যাটফর্মে রাত নামলে যাত্রী ধীরে ধীরে কমে আসে। কোলাহল কিছুটা থেমে যায়। তখন একটি ছোট্ট নাঈম ম্লান আলোয় বই খুলে বসে। চারদিকে নেই কোনো পড়ার টেবিল, নেই ঘর, নেই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।

তবু তার চোখে জ্বলজ্বল করে একটি স্বপ্ন—একদিন পড়াশোনা করে নিজের জীবন বদলাবে, বদলে দেবে পরিবারের ভাগ্যও। সেই স্বপ্নই প্রতিদিন তাকে স্কুলে নিয়ে যায়, আবার রাতের প্ল্যাটফর্মে বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments