Saturday, July 25, 2026
Homeবিদেশি কোচদের বিশ্বকাপ— ফাঁড়া কাটল না

বিদেশি কোচদের বিশ্বকাপ— ফাঁড়া কাটল না

টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এল বিশ্বকাপের এক চিরচেনা পরিসংখ্যান। এই প্রতিযোগিতার ৯৬ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো বিদেশি কোচের অধীনে কোনো দল বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।

এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের মধ্যে রেকর্ড ২৬টি খেলেছে বিদেশি কোচের অধীনে। তাদের মধ্যে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ২৫-এর একাধিক শক্তিশালী দলও ছিল। কোচদের তালিকায় ছিলেন কার্লো আনচেলত্তি, মার্সেলো বিয়েলসা, রবার্তো মার্তিনেজ, মরিসিও পচেত্তিনো ও টুখেল মতো বিশ্বখ্যাত নাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাও বিশ্বকাপের মঞ্চের ফাঁড়া কাটাতে পারেননি।

বিদেশি কোচদের মধ্যে সবচেয়ে দূর এগিয়েছিলেন জার্মানির টুখেল। ইংল্যান্ডকে নিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন সেমিফাইনালে। তবে সেখানে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলে হেরে থেমে যায় ইংল্যান্ডের শিরোপার স্বপ্ন।

অন্যদিকে, আর্জেন্টিনা খেলেছে স্বদেশি কোচ স্কালোনির অধীনে। একইভাবে ফাইনালে ওঠা অপর দলটির দায়িত্বেও স্বদেশি কোচ— স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে, যিনি স্কালোনির কোচিং-গুরু হিসেবেও পরিচিত।

১৯৩০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত আগের ২২টি বিশ্বকাপের প্রতিটি চ্যাম্পিয়ন দলই শিরোপা জিতেছে নিজ দেশের কোচের অধীনে। এবারও সেই ধারার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ব্রাজিলের পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসও এরই সাক্ষ্য বহন করে।

অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিদেশি কোচরা মাত্র দুবার শিরোপার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ১৯৫৮ সালে ইংল্যান্ডের জর্জ রেইনর সুইডেনকে এবং ১৯৭৮ সালে অস্ট্রিয়ার আর্নস্ট হ্যাপেল নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু তারা যথাক্রমে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হন।

এছাড়া, ২০০২ সালে নেদারল্যান্ডসের গুস হিডিঙ্ক দক্ষিণ কোরিয়াকে, ২০০৬ সালে ব্রাজিলের লুইজ ফেলিপে স্কোলারি পর্তুগালকে এবং ২০১৮ সালে স্পেনের রবার্তো মার্তিনেজ বেলজিয়ামকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু শিরোপা জয়ের স্বপ্ন তাদেরও অধরা থেকে যায়। এবার টুখেলও ইতিহাস বদলের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে শেষমেশ ব্যর্থ হন।

ক্লাব ফুটবলে অন্যতম সফল কোচ টুখেল। চেলসিকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি পিএসজির হয়ে দুটি ফরাসি লিগ ওয়ানের শিরোপা এবং বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একটি জার্মান বুন্দেসলিগার শিরোপা পেয়েছেন। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এটিই টুখেলের প্রথম দায়িত্ব।

এবারের বিশ্বকাপে বিদেশি কোচদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন আর্জেন্টাইন— পাঁচজন। তারা হলেন পচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র), বিয়েলসা (উরুগুয়ে), নেস্তর লরেঞ্জো (কলম্বিয়া), সেবাস্তিয়ান বেকাচেচে (ইকুয়েডর) ও গুস্তাভো আলফারো (প্যারাগুয়ে)।

ফ্রান্স থেকে ছিলেন চারজন— রুদি গার্সিয়া (বেলজিয়াম), সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে (ডিআর কঙ্গো), হার্ভে রেনার (তিউনিসিয়া) ও সেবাস্তিয়ান মিনিয়ে (হাইতি)। ইতালি থেকে ছিলেন তিনজন— আনচেলত্তি (ব্রাজিল), ভিনসেঞ্জো মন্তেলা (তুরস্ক) ও ফাবিও কানাভারো (উজবেকিস্তান)। অর্থাৎ ২৬ জন বিদেশি কোচের মধ্যে ১২ জনই এসেছেন আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও ইতালি থেকে।

পর্তুগালের দায়িত্বে ছিলেন স্পেনের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। ২০২৩ সাল থেকে তিনি দলটির দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে বেলজিয়ামকে ২০১৮ বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান এনে দেওয়া এই কোচ এবার পর্তুগালকে শেষ ষোলোর বেশি এগিয়ে নিতে পারেননি। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে পর্তুগাল বিদায় নেওয়ার পর পদ ছাড়েন মার্তিনেজ।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন আনচেলত্তি। ৬৭ বছর বয়সী এই কোচ ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সফল। রিয়াল মাদ্রিদকে তিনবার ও এসি মিলানকে দুবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানোর পাশাপাশি ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগেই শিরোপা জেতা একমাত্র কোচ তিনি।

তবে জাতীয় দলের ফুটবল ছিল তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোচিং করাননি তিনি। শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফলে ব্রাজিলের বহু প্রতীক্ষিত ‘হেক্সা মিশন’ আবারও অধরাই থেকে যায়।

এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের পাঁচটি বিশ্বকাপই এসেছে স্বদেশি কোচদের হাত ধরে— ভিসেন্তে ফিওলা (১৯৫৮), আইমোরে মোরেইরা (১৯৬২), মারিও জাগালো (১৯৭০), কার্লোস আলবার্তো পারেইরা (১৯৯৪) ও স্কোলারি (২০০২)।

আলোচিত বিদেশি কোচদের মধ্যে বিয়েলসার উরুগুয়ে বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই। পচেত্তিনোর যুক্তরাষ্ট্র ও লরেঞ্জোর কলম্বিয়া থামে শেষ ষোলোতে। তাছাড়া, বেকাচেচের ইকুয়েডর ও আলফারোর প্যারাগুয়ের যাত্রা শেষ হয় শেষ বত্রিশে।

ফ্রান্সের কোচদের মধ্যে গার্সিয়ার বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নেয়। দেসাব্রের ডিআর কঙ্গো পৌঁছায় শেষ বত্রিশ পর্যন্ত। রেনারের তিউনিসিয়া ও মিনিয়ের হাইতির যাত্রা শেষ হয় গ্রুপ পর্বেই।

সব মিলিয়ে, বিদেশি কোচদের সংখ্যা যেমন ছিল নজিরবিহীন, তেমনি তাদের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থেকেছে সেমিফাইনাল পর্যন্ত। টুখেল সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছেও পারেননি ইতিহাস বদলাতে। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে স্বদেশি কোচদের ঐতিহাসিক আধিপত্য— ২০২৬ সালেও অটুট রইল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments