Friday, July 24, 2026
Homeভেস্তে গেল ইরান চুক্তি, বিকল্প কী ট্রাম্পের

ভেস্তে গেল ইরান চুক্তি, বিকল্প কী ট্রাম্পের

গত ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ বড়জোর ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ স্থায়ী হবে। এরপর কেটে গেছে চার মাসের বেশি সময়। 

সংক্ষিপ্ত এক বিরতির পর যুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে উঠছে। এটি শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালায় ইরান। জাহাজগুলো তখন ইরানের উপকূল এড়িয়ে ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল।

এর জবাবে ইরানের একটি সামরিক ঘাঁটি ও অন্তত দুটি সেতুতে বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাবে ইরান ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালায়।

সপ্তাহ শেষে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইরনার বরাতে দেশটির রেভ্যুলেশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয়, হরমুজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এর জবাবে সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানান, ইরানের তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ আবার কার্যকর করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ‘প্রণালির রক্ষক’ ঘোষণা করে এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ টোল আরোপ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর) জানায়, ১৮ জুন ভার্সাইয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেন ট্রাম্প।

কূটনীতি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভাষ্য, চুক্তির পরিণতিই আজকের পরিস্থিতি। মূলত হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিনিময়ে চুক্তিটি ইরানের জন্য বেশ লাভজনক ছিল। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাসের ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।

চুক্তিতে ট্রাম্প ইরানকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। এতে অন্তর্ভূক্ত ছিল—নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড় এবং পুনর্গঠনে সহায়তা।

বিনিময়ে ইরানের কাছে ট্রাম্প দুটি বিষয় চেয়েছিলেন—প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলের সুযোগ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসা।

সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে জলপথটি খুলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ট্রাম্প। তার অন্য সামরিক লক্ষ্যগুলোও পূরণ হয়নি। যেমন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো, দেশটিকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ছাড়তে বাধ্য করা, অঞ্চলজুড়ে সন্ত্রাসী প্রক্সিদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করানো।

এসব ব্যর্থতার পরই আসে এই চুক্তি, যাকে ব্যাপকভাবে তোষণনীতি বলে সমালোচনা করা হয়েছিল।

কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থিরা শাসকেরা এতে সন্তুষ্ট নন।

মার্কিন কূটনীতি বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স বুট কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদনে লিখেছেন, চুক্তি থেকে ইরান বিপুল লাভ ঘরে তুলেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেই থামেনি। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে পুরো বিশ্বকে জিম্মি করে রাখা যায়, তা ইরান ভালোভাবেই দেখিয়েছে। তাই সহসা তারা এর নিয়ন্ত্রণ ছাড়ছে না।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী জোর দিয়ে বলছে, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে যেতে হবে ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে। যেসব জাহাজ এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, সেগুলোতেই হামলা চালাচ্ছে আইআরজিসি।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, জাহাজ চলাচলের ওপর ‘ব্যবহার ফি’ বা টোল আরোপ থেকে মাত্র ৬০ দিন বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইরান। এখন দেশটি নিশ্চিত করতে চায়, জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অর্থ দিতে বাধ্য হয়। এর ব্যতিক্রম হলে তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে।

প্রত্যাশিতভাবেই ট্রাম্প ইরানে বোমা হামলা চালিয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনর্বহাল করে এর জবাব দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি দাবি করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই টোল আদায় করবে।

এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলপথে জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘদিনের একটি অঙ্গীকার থেকে দৃশ্যত সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

টোল আদায়ের এই হুমকি সম্ভবত নিছক দাম্ভিকতা। তবে বোমা হামলা ও অবরোধ বাস্তব। প্রশ্ন হলো, এগুলো আসলে কী অর্জন করবে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৯ দিন ধরে ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের চাওয়া অনুযায়ী ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি মেনে নিতেও ইরানকে বাধ্য করা যায়নি।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্টো হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোকে জিম্মি করে ইরানই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। ফলে তিনি একটি অপমানজনক সমঝোতা স্মারকে সম্মত হন।

সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় ইরানের শাসকগোষ্ঠী আর্থিক সুবিধা নেওয়ারও সুযোগ পেয়েছে। এতে দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প এখন আগের চেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক জিনশার হিসাব বলছে, ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নেওয়ার পর থেকে তেল রপ্তানি করে ইরান আয় করেছে অন্তত ৫০০ কোটি ডলার।

মৌলিক সমস্যাটি আগেও উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যতই দম্ভ দেখান না কেন, ইরানকে নতজানু করার মতো ভালো কোনো সামরিক বিকল্প তাদের হাতে নেই।

ইরানকে সত্যিকার অর্থে পরাজিত করতে এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে হলে প্রয়োজন হবে কয়েক লাখ মার্কিন সেনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ। কিন্তু এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে মার্কিন জনগণের কাছে যতটা অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তাই এমন পরিস্থিতি কল্পনা করাও অসম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের কুইনিপ্যাক ইউনিভার্সিটি সাম্প্রতিক এক জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইরান যুদ্ধ সার্থক নয়।

ম্যাক্স বুট লিখেছেন, ওভাল অফিসে ট্রাম্পের আগের অনেক প্রেসিডেন্টও একই সংকটে পড়েছিলেন। এখন ট্রাম্পও সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি। তিনি সীমিত উপায়ে সীমিত যুদ্ধ চালাচ্ছেন। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, এই যুদ্ধ থেকে অর্জনও হচ্ছে সীমিত।

ট্রাম্পের যুদ্ধ সম্পর্কে বড়জোর এটুকুই বলা যায়, এতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। তবে দেশটির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি আগের মতোই রয়ে গেছে। বরং যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বকে চাপে রাখার সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে ইরান।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফেরেনি। এখন ইরান প্রণালিটি বন্ধ বলে দাবি করায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ পথে জাহাজ চলাচল আরও কমে যাবে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি অস্বস্তিকর বিকল্প রয়েছে। এক, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের টোল আদায় মেনে নেওয়া। দুই, সামরিক সংঘাত আরও তীব্র করার বড় ঝুঁকি নেওয়া।

চার মাসের বেশি সময় পর ইরান যুদ্ধ আবারও একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, শুধু আশাবাদী ধারণার ওপর ভরসা করে এবং যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া প্রেসিডেন্টদের নিজেদের ইচ্ছায় যুদ্ধ শুরু করার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments