Thursday, July 23, 2026
Homeঅপরাধমালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: সরিষার ভেতর এখনো সেই ‘পুরোনো ভূত’

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: সরিষার ভেতর এখনো সেই ‘পুরোনো ভূত’

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ আবার শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই প্রক্রিয়াকে ঘিরে পুরোনো অনিয়মের আশঙ্কা নতুন করে সামনে এসেছে। ঢাকা ও কুয়ালালামপুর বারবার নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্বেগ কাটছে না।

গত ২১ ও ২২ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর আশা তৈরি হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সীমিত স্বচ্ছতা ও কথিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে সমালোচিত কর্মী নিয়োগব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আসবে।

সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বৈঠকের পর দুই দেশ শ্রম অভিবাসনবিষয়ক বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন চুক্তির খসড়া তৈরিতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডাব্লিউজির) বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু জেডাব্লিউজির বৈঠক হওয়ার আগেই এবং নতুন এমওইউ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই দুই দেশের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—আগের সেই বিতর্কিত ব্যবস্থাতেই কি কর্মী নিয়োগ শুরু হতে যাচ্ছে?

গত সোমবার মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর রামানান বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে একগুচ্ছ ডিজিটাল সংস্কারের ঘোষণা দেন।

কুয়ালালামপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি কর্মী কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার (এফডাব্লিউসিএমএস) আওতায় থাকা ই-কোটা মডিউলের মাধ্যমে কোটা আবেদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।

এফডাব্লিউসিএমএসের নাম উচ্চারিত হতেই পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে। কারণ, বেস্টিনেট পরিচালিত এই প্ল্যাটফর্মটি বহু বছর ধরেই নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

বেস্টিনেটের পরিচালক আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০১৬-১৮ এবং ২০২২-২৪ সময়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমিক নিয়োগে কারসাজির অভিযোগ উঠেছিল। তবে কোম্পানিটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

২০২৪ সালের জুনে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, চাকরি ছাড়াই কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পৌঁছানো এবং নানা ধরনের শোষণের অভিযোগের পর বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে মালয়েশিয়া। এ ঘটনায় দুই দেশেই সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয় কুয়ালালামপুর।

তবে মালয়েশিয়ার কর্মী নিয়োগ খাতের একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ব্যবসায়ী লবি এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের প্রভাবমুক্ত হতে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষকেই বেগ পেতে হচ্ছে।’

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আগের নিয়োগব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারকারী রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব দূর না করা গেলে প্রকৃত সংস্কার সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, সমস্যা এফডাব্লিউসিএমএসে নয়, সমস্যা হচ্ছে এটি যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে।

তার ভাষায়, ‘ব্যবস্থার ভেতরের কারসাজিই আসল সমস্যা।’

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগপর্বে মালয়েশিয়া মাত্র ১০১টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেয়।

অন্য লাইসেন্সধারী এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের কাছ থেকে চাহিদাপত্র পেলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত এফডব্লিউসিএমএসে তালিকাভুক্ত ওই ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমেই প্রক্রিয়াকরণ করতে হতো।

ফখরুল ইসলামের অভিযোগ, বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর তদারকি ছাড়াই কোন কোন মেডিকেল সেন্টার অনুমোদন পাবে, তা নির্ধারণের মাধ্যমে চিকিৎসা পরীক্ষার ব্যবস্থার ওপরও বেস্টিনেটের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল।

অভিবাসনবিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ হারুন-আল-রশিদ বলেন, সমস্যার সূত্রপাত আরও আগে, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক কোটা অনুমোদনের পর্যায়েই।

তার ভাষ্য, কিছু মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি শ্রমিকের কোটা নিলেও শেষ পর্যন্ত সবাইকে কাজে নেয়নি। ফলে বহু অভিবাসী মালয়েশিয়ায় পৌঁছে বেকার হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘এর ফলে ব্যাপক বেকারত্ব ও শোষণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, আর এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে লাভবান হয় দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।’

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় চাকরি পেতে বাংলাদেশি কর্মীদের চার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় আট লাখ নিবন্ধিত বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বার্তাতেও কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে।

গত মঙ্গলবার প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ঘোষণা দেন, সোমবার থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।

সিলেটে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সুফল ইতোমধ্যেই আসতে শুরু করেছে।

কিন্তু পরদিনই তার মন্ত্রণালয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নির্দেশ দেয়, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘোষণা না করা পর্যন্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর, পাসপোর্ট সংগ্রহ, মেডিকেল পরীক্ষা বা অর্থ নেওয়া যাবে না।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সরকারি ঘোষণা ছাড়া পরিচালিত যেকোনো নিয়োগ কার্যক্রম অননুমোদিত বলে গণ্য হবে।

অভিবাসী অধিকারবিষয়ক সংগঠন মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স নেটওয়ার্ক বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, সুস্পষ্ট নিয়োগ কাঠামো ছাড়া মন্ত্রীর এই ঘোষণা সম্ভাব্য কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে অবৈধ দালালদের উৎসাহিত করতে পারে।

সংগঠনটি জানতে চেয়েছে, কর্মী নিয়োগ কি বর্তমান এমওইউ অনুযায়ী হবে, নাকি সংশোধিত চুক্তির আওতায়। পাশাপাশি নিয়োগপদ্ধতি, এজেন্সি নির্বাচন এবং সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে তারা।

ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্র্যান্টস অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক আনিসুর রহমান খান বলেন, কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা। 

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই দেখি সরকার রাজনৈতিক কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়।’

গবেষক হারুনের মতে, মালয়েশিয়ার চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহে সব লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির সমান সুযোগ থাকা উচিত।

তিনি বলেন, ‘যে কোনো লাইসেন্সধারী এজেন্সি যেন চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী নিয়োগ করতে পারে। অন্যথায় কারসাজির সুযোগ থেকেই যাবে।’

তিনি আরও বলেন, চাকরির অফারগুলো সত্যিই বৈধ কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মালয়েশিয়া সরকারের। কোনো অনিয়ম হলে তারও জবাবদিহি থাকতে হবে।

নতুন করে কর্মী নিয়োগ শুরুর আগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের আহ্বান জানিয়ে হারুন বলেন, চুক্তিতে সরকার ও বেসরকারি অংশীজনদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments