Saturday, July 25, 2026
Homeযুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত, তেলের দাম ১০০ ডলার ছুঁইছুঁই

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত, তেলের দাম ১০০ ডলার ছুঁইছুঁই

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের টানা ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।

অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং তিনি মনে করেন, তেহরান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আলোচনার ব্যাপারে বেশি আন্তরিক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে প্রস্তুত।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের সামনে দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা, যাতে তাদের সব সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যটি হলো একটি সমঝোতায় পৌঁছানো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’

টানা হামলা, পাল্টা হামলার হুমকি

দুই সপ্তাহ আগে ভেঙে পড়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র টানা ১৩ রাত ধরে ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবারও ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

এর জবাবে ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে এবং সতর্ক করে বলেছে, ওই দেশগুলোর যেসব বেসামরিক স্থাপনা মার্কিন বাহিনী ব্যবহার করছে, সেগুলোও ভবিষ্যতে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

ইরানি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং, ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প দোহায় অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

কুয়েত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ‘শত্রু লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করেছে। একই সময়ে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ব্যবহৃত একটি নজরদারি টাওয়ার উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, সেতু, এমনকি খারগ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্র দখলে স্থলবাহিনী পাঠানোর হুমকিও দিয়েছেন। পাশাপাশি পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ‘পিক্যাক্স মাউন্টেন’-এ হামলার কথাও বলেছেন। 
তবে শুক্রবার তিনি জানান, নতুন বড় ধরনের হামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ দিকে সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ৫৯ জন নিহত এবং ৬৬৬ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ৭ জুলাইয়ের পর অন্তত ১০০ সেনা আহত হওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হলেও রয়টার্সকে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, মোট আহত সেনার সংখ্যা ৫০০-এর বেশি।

ইরানের সর্বোচ্চ যৌথ সামরিক কমান্ডের প্রধানের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রত্যেক নিহত ইরানির বদলে একজন মার্কিন সেনাকে হত্যা করা হবে।

হুতি হামলায় নতুন সংকট

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলা। তারা লোহিত সাগরে দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প বলেছেন, ভবিষ্যতে হুতিদের যেকোনো হামলার জন্য তিনি ইরানকেই দায়ী করবেন।

সৌদি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, শুক্রবার লোহিত সাগরে হামলায় একটি সৌদি জাহাজ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়। তবে স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।

তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।

শুক্রবার দিনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার অতিক্রম করে, যদিও পরে কিছুটা কমে ৯৯ দশমিক ৬২ ডলারে নেমে আসে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ব্রেন্টের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।

মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৮২ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ২৪ ডলার বেশি।

বৃহস্পতিবার হুতিদের হামলার পর একদিনেই তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ১০০ ডলারে পৌঁছেছিল।

নৌপথে বিঘ্ন, বাড়ছে পরিবহন ব্যয়

বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখন সবচেয়ে বেশি নজর রাখছে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির পরিস্থিতির দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল এই দুটি নৌপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছে।

হুতিদের হামলার পর একাধিক তেলবাহী জাহাজ পথ পরিবর্তন করে সুয়েজ খাল হয়ে আফ্রিকা ঘুরে এশিয়ায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে যাত্রাপথ প্রায় এক মাস দীর্ঘ হচ্ছে এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ১৫টির মতো। রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার হরমুজ দিয়ে মাত্র একটি তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল করেছে, যা মে মাসের পর সর্বনিম্ন।

বৈশ্বিক বাজারে চাপ

তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়েছে বিশ্ব শেয়ারবাজারেও।

শুক্রবার জাপানের নিক্কেই সূচক ২ দশমিক ৮ শতাংশ, হংকংয়ের হ্যাং সেং ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমে বন্ধ হয়েছে।

আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট ২ শতাংশের বেশি পড়ে যায়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১০ ডলারে পৌঁছেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি। ডিজেলের গড় দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২৪ ডলার।

কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে

তবে যুদ্ধের মধ্যেও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের উদ্যোগের পর পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থগিত আলোচনা পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এ সপ্তাহে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির ইসলামাবাদ সফরে এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলে পাকিস্তানের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। মঙ্গলবার দুই নেতার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান পাঁচ মাসে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে এই বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments