Friday, July 24, 2026
Homeঅপরাধলটারি বাদ দিয়ে ফের ভর্তি পরীক্ষা: শিশুদের ওপর চাপ, কোচিংমুখী অভিভাবকরা

লটারি বাদ দিয়ে ফের ভর্তি পরীক্ষা: শিশুদের ওপর চাপ, কোচিংমুখী অভিভাবকরা

আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে আবারও লিখিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। সরকারের এই পদক্ষেপে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে অনেকেই এখন কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের (প্রাইভেট টিউটর) দ্বারস্থ হচ্ছেন।

সরকারি স্কুলে লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতির পরিবর্তে লিখিত পরীক্ষা চালু হতে যাচ্ছে। অভিভাবকদের উদ্বেগ দূর করতে গত মাসে শিক্ষামন্ত্রী আ স ম এহছানুল হক মিলন জানান, ছোট শিশুদের ভর্তি প্রক্রিয়াটি সহজ হবে এবং এতে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াকে উৎসাহিত করা হবে না।

তবে রাজধানীর বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, তারা ইতোমধ্যেই প্রথম শ্রেণির ভর্তিচ্ছুদের জন্য বিশেষ কোর্স ও নির্দিষ্ট স্কুলভিত্তিক গাইডলাইন দেওয়া শুরু করেছে।

অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্কুলজীবন শুরুর আগেই শিশুদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, স্কুলে ভর্তির জন্য শিশুদের পরীক্ষা দেওয়া উচিত নয়। এটা তাদের আর তাদের পরিবারের প্রতি অন্যায্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের চাপ শিশুদের ভবিষ্যৎ শেখার প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ দূর করতে ২০১১ সালে সরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে লটারিভিত্তিক ভর্তি প্রথা চালু করা হয়েছিল। চলতি বছরের ১৬ মার্চ শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেন যে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই লটারি পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে।

একই দিনে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ জানায়, ২০২৭ সাল থেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারিভিত্তিক ভর্তি প্রথা বাতিল করা হবে এবং সব অংশীদারের সঙ্গে আলোচনার পর একটি নতুন ভর্তি প্রক্রিয়া চালু করা হবে।

বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ছেলে এবং ১৭ লাখ ৯৯ হাজার মেয়ে।

কোচিং সেন্টারগুলো আবারও ব্যস্ত

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফার্মগেটের একটি কোচিং সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা জানান, তারা হলি ক্রস স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু শিশুদের জন্য একটি বিশেষ ব্যাচ শুরু করেছেন। সেন্টারটি ভর্তির জন্য ১ হাজার ৭০০ টাকা এবং মাসিক ফি ১ হাজার ২০০ টাকা ধার্য করছে।

তিনি জানান, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে ভর্তির জন্যও একই ধরনের প্রস্তুতির প্রোগ্রাম চালু আছে। তবে তাদের চেষ্টা থাকে যেন এই প্রস্তুতি শিশুদের জন্য মানসিক চাপের কারণ না হয়ে ওঠে।

ফার্মগেটের আরেকটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক জানান, তারা ঢাকার ৩৯টি স্কুলের ভর্তি প্রস্তুতি করান এবং প্রতিটি ব্যাচে প্রায় ২০ জন শিশুকে ভর্তি করেন। সেখানে ভর্তি ফি ৩ হাজার টাকা এবং মাসিক ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ ভর্তির সময় মোট ৬ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। ক্লাস সপ্তাহে তিন দিন, সরাসরি ও অনলাইন উভয় মাধ্যমেই নেওয়া হয়।

মিরপুর-১ এর একটি কোচিং সেন্টারের কর্মকর্তা জানান, ভর্তি প্রস্তুতি কোর্সের চাহিদা বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রথম শ্রেণির সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি ব্যাচ পরিচালনা করছে। শিশুরা সপ্তাহে চার থেকে পাঁচ দিন ক্লাসে আসে। সেন্টারটি ছয় মাসের প্যাকেজের জন্য ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা নেয়, আর যারা প্যাকেজ নেয় না তারা মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা দেয়।

অনেক অভিভাবক কোচিং সেন্টারের বদলে গৃহশিক্ষক রাখছেন।

পল্লবীর বাসিন্দা গৃহিণী রুমি আক্তার জানান, সন্তানকে কোচিংয়ে পাঠাতে চান না দেখে তিনি তার সাত বছরের ছেলের জন্য মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় একজন গৃহশিক্ষক রেখেছেন। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা ফের চালু করার বিষয়ে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, একদম কম বয়সেই শিশুদের প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করা হচ্ছে।

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা এবং ছয় বছরের এক মেয়ের মা ফাতেমা চৌধুরীও একই মত প্রকাশ করে বলেন, ছয় বা সাত বছরের একটা বাচ্চা ভর্তি পরীক্ষায় বসার জন্য খুবই ছোট। তারা আসলে কতটাই বা বোঝে? এই পরীক্ষাগুলো তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে।

তবে একজন অভিভাবক সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। মিরপুর-১০ এর শারমিন আক্তার রিমা জানান, তার ছেলে নাম লিখতে পারে এবং সহজ বাক্য পড়তে পারে, তবুও লটারির কারণে কয়েকটি স্কুলে ভর্তি হতে পারেনি। তিনি লটারি পদ্ধতিকে দায়ী করে বলেন, লটারির ফল সম্পূর্ণভাবে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। লটারিতে ভাগ্যের জোর ছিল না বলে কি আমার সন্তান অযোগ্য হয়ে গেল?

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্কুলে ভর্তি নিয়ে এই মানসিক চাপ মূলত তৈরি হয় মানসম্মত স্কুলের বৈষম্য এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ‘ব্র্যান্ড ইমেজের’ কারণে। লটারি ও ভর্তি পরীক্ষার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে ভর্তি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

লটারি পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, লটারির মাধ্যমে আমরা বিদ্যালয় জীবনের একদম শুরুতেই একজন শিক্ষার্থীকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।

অন্যদিকে, ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের ওপর চাপ তৈরি করে এবং এটি শুধু শিশুদের নয়, অভিভাবকদের জন্যও এক ধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। কিছু স্কুল সামাজিক ‘ব্র্যান্ড’ হয়ে ওঠার কারণে অভিভাবকরা যেকোনো মূল্যে সন্তানকে সেখানে ভর্তি করাতে চান। তবে তাদের ভর্তিযুদ্ধ তৈরি করা উচিত নয়।

তার মতে, সব স্কুলের মান যদি একইরকম হতো, তাহলে এই প্রতিযোগিতা থাকত না।

তিনি সরকারকে ভর্তি প্রক্রিয়া অভিন্ন করে এবং এলাকাভিত্তিক বাধ্যবাধকতা বজায় রেখে প্রতিযোগিতা কমানোর পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে ভর্তি নিয়ে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিতে পরিবারের প্রতিও আহ্বান জানান।

একইরকম মত প্রকাশ করে অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, লটারি পদ্ধতি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যখন কোনো সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় না, তখন সেটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এটা সাময়িক পদক্ষেপ হতে পারে।

তিনি উল্লেখ করেন, সঠিক সমাধান হলো এলাকার প্রতিটি বিদ্যালয়ের মান উন্নত করা, যাতে ক্যাচমেন্ট-এরিয়া (নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক) ব্যবস্থার অধীনে শিশুরা তাদের বাড়ির কাছেই পড়তে পারে। তবে এমন ব্যবস্থা কাজ করার জন্য সব স্কুলে যোগ্য শিক্ষক, পর্যাপ্ত টয়লেট, অবকাঠামো ও উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শ্রেণিকক্ষেই যদি পড়া শেষ করিয়ে দেওয়া হয়, তবে কোচিং সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই চলে যাবে। স্কুলের পড়া যদি স্কুলেই শেষ হয়, তাহলে শিশুরা বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবে ও খেলাধুলা করবে। স্কুলের পড়া কেন ঘরে টেনে আনা হবে? প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষা।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মঈনউদ্দীন আল মাহমুদ সোহেল জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়া এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রথম শ্রেণির ভর্তির জন্য কোচিং সেন্টারে কোর্স চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, তারা বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীর নজরে আনবেন।

তবে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেজে যোগাযোগ করা হলেও শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ও সচিব আবদুল খালেক কোনো সাড়া দেননি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments