Wednesday, July 22, 2026
Homeসব খাবারের ব্যবসায় লাগবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন

সব খাবারের ব্যবসায় লাগবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন

রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে আমদানিকারক ও বড় আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, খাবারের ব্যবসায় জড়িত এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। নতুন এক বিধিমালায় এ কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, খাদ্যের মান উন্নত করতে এবং খাদ্য ব্যবসার ওপর নজরদারি বাড়াতেই এই নিয়ম করা হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ীরা এই বিধিমালার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, ‘নিরাপদ খাদ্য (নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং) প্রবিধানমালা’ নামের এই নতুন নিয়ম ব্যবসার ওপর বোঝাই শুধু বাড়াবে।

গত ১৬ জুলাই নতুন এই বিধিমালাটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

বিধিমালায় খাদ্য ব্যবসাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শুধু নিবন্ধনই যথেষ্ট হবে। তবে যারা বিশেষ ধরনের বা অতি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নিয়ে কাজ করে, তাদের লাইসেন্স নিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, রেস্তোরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে।

প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) নিবন্ধন করতে হবে।

এমনকি রাস্তার পাশে যারা পিঠা, পুরি ও পেঁয়াজুর মতো খাবারের ব্যবসা করেন, নতুন এই নিয়মের আওতায় তাদেরকেও নিবন্ধন নিতে হবে।

অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে, যেমন: শিশুদের ফর্মুলা দুধ এবং বয়স্ক বা নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য তৈরি খাবার, তাদের লাইসেন্সের জন্য কঠোর নিয়ম মানতে হবে।

ফর্টিফায়েড খাবার (ভিটামিন বা খনিজ যুক্ত), অর্গানিক পণ্য, জিনগত পরিবর্তন করা খাবার (জিএমও) এবং বিকিরণের মাধ্যমে সংরক্ষিত খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও লাইসেন্সের আওতায় পড়বে। এ ছাড়া বেসরকারি খাদ্যের গুদাম ও হিমাগারকেও (কোল্ড স্টোরেজ) লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

এই বিধিমালা ভোজ্যতেলের পাইকারি বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মজুত, আমদানি এবং বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

সাধারণত, নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং এরপর এটি নবায়ন করতে হবে।

খরচ ও ফি হার

বিধিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধনের ফি শুরু হবে ১ হাজার টাকা থেকে এবং নবায়নের খরচ হবে ৫০০ টাকা।

খাবারের ব্যবসা করে এমন বড় প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি ফ্লোরের আকারের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হবে। ছোট দোকানের জন্য এই ফি ১ হাজার টাকা এবং ১০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫ হাজার টাকা হবে।

খাদ্য মজুত করার গুদামের জন্য ফি বেশি ধরা হয়েছে। ২০ হাজার বর্গফুটের চেয়ে বড় গুদামের ক্ষেত্রে নতুন লাইসেন্স নিতে ৪০ হাজার টাকা ফি দিতে হবে।

তবে, শিল্প খাতের নেতারা ফিয়ের এই কাঠামোর সমালোচনা করেছেন। তারা বলছেন, কিছু ফি নির্দিষ্ট হারের বদলে পণ্যের মোট ‘কস্ট অ্যান্ড ফ্রেট’ বা সিঅ্যান্ডএফ (পণ্য ও পরিবহনের মোট ব্যয়) মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ব্যবসার ওপর বোঝা হয়ে আসবে।

দেশের অন্যতম শীর্ষ কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, নতুন নিবন্ধন এবং লাইসেন্সের নিয়মটি ভালো উদ্দেশ্যে করা হলেও এটি ব্যবসার জন্য বোঝা তৈরি করতে পারে, কারণ এখানে আগে থেকেই অনেক ধরনের নজরদারি ও নিয়ম রয়েছে।

তিনি বলেন, খাদ্য প্রস্তুতকারক, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক এবং বাজারজাতকারীদের ইতিমধ্যে ব্যবসা শুরু করতে ১৭টি বিভিন্ন সরকারি বিভাগ ও সংস্থা থেকে লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়।

কামরুজ্জামান বলেন, ‘তাদের উদ্দেশ্য প্রশংসার যোগ্য। তবে চিন্তার বিষয় হলো, শুধু ব্যবসা শুরু করার জন্যই আমাদের ইতিমধ্যে ১৭টি ভিন্ন সংস্থা থেকে লাইসেন্স ও নিবন্ধন নিতে হয়।’

তিনি বলেন, এতগুলো সংস্থার নিবন্ধন ও ফির কারণে কোনো ভালো ফল না এলেও ব্যবসা পরিচালনার খরচ ঠিকই বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নতুন এই নিয়মগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, তাদেরকে আগে থেকেই নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এখন নতুন আরেকটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এলে তাদের কাজের আওতা নিয়ে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, লাইসেন্সিংয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ যদি নির্দিষ্ট ফি-এর বদলে সিঅ্যান্ডএফের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়, তবে সেটা ব্যবসার ওপর আরও চাপ বাড়াবে।

তিনি বলেন, ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে এক জানালার (সিঙ্গেল উইন্ডো) সেবার বিষয়ে সরকারের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, আমলাতন্ত্র তার পরিপন্থি।’

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, কোনো বিস্তৃত পরিকল্পনা ছাড়া শুধু একটি বিধিমালা দিয়ে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

একাধিক নিয়মের পরিবর্তে তিনি এমন একটি ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত খাদ্য নিরাপত্তা আইন করার আহ্বান জানান, যা হঠাৎ কোনো গেজেট জারির মাধ্যমে নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

সমিতির হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার রেস্তোরাঁ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শুধু আইন বা এ ধরনের গেজেট প্রকাশ করেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।’ তিনি আরও বলেন, এই নতুন নিয়মকানুন ব্যবসার ওপর চাপ বাড়াবে এবং দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

ব্যবসায়ী নেতারা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

এসব উদ্বেগের জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (এনফোর্সমেন্ট) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, তারা শুরুতেই শিল্প পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদনের ওপর নজরদারি করার দিকে মনোযোগ দেবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো শিল্প পর্যায়ের উৎপাদন এবং যারা বড় পরিসরে উৎপাদন করছে, সেই সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।’

আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মতো সংস্থা থেকে প্রত্যয়ন পেয়েছে, তাদের এখনই কোনো হস্তক্ষেপে পড়তে হবে না। তবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান সার্টিফিকেশনের বাইরে গিয়েও স্বাধীনভাবে খাদ্যের মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়া নজরদারি করবে।

তিনি জানান, আমদানি করা খাদ্যপণ্য, যেমন মাংস ও মধুর ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণা এবং ভেজাল আছে কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য চারটি বন্দরে ২৫ জন জ্যেষ্ঠ খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগ দিচ্ছেন তারা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments