Friday, July 24, 2026
Homeহরমুজের পর বাব এল-মান্দেবেও নজর ইরানের, হুতিদের দিয়ে নতুন চাপের ইঙ্গিত

হরমুজের পর বাব এল-মান্দেবেও নজর ইরানের, হুতিদের দিয়ে নতুন চাপের ইঙ্গিত

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর ইরান এখন তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক কৌশল ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই কৌশল হলো, ইয়েমেনে তাদের হুতি মিত্রদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব এল-মান্দেব বন্ধ করে দেওয়া।

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ইরানের নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি পরিবহনপথ।

এদিকে ইরানের অভ্যন্তরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও জোরদার হচ্ছে। একইসঙ্গে বাড়ছে হুতিদের হামলাও।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই দুই ঘটনা মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে—সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত করছে তেহরান। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য হুমকি তৈরি করে দেশটি ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে ইরান ইতোমধ্যে তাদের সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত সম্পদের শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। এখন বাব এল-মান্দেবে দ্বিতীয় আরেকটি চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরির জন্য দেশটি প্রস্তুত হচ্ছে। এই সংকীর্ণ জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই পথ দিয়েই সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে।

ইরানের প্রেস টিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করতে প্রস্তুত রয়েছে।

তিনি বলেন, এমন পদক্ষেপে তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

হুতি প্রতিরোধ আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ রয়টার্সকে বলেন, ইয়েমেনে হামলা চালাতে সৌদি আরবকে উসকানি দিচ্ছে ওয়াশিংটন। এমন উসকানি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হবে না।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি হলে বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও হরমুজ প্রণালি সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হবে। তখন ভয়াবহ এক ধাক্কায় তেলের দাম বেড়ে যাবে।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ যদি তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হয়, তবে বাব এল-মান্দেব হতে পারে তাদের হাতে থাকা শেষ বড় বিকল্প।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ জারজেস বলেন, ইরান শেষ পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।

তার মতে, তেহরান ওয়াশিংটনকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে তারা একইসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে সংঘাতটি দ্বিপক্ষীয় বিরোধ থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ভিত্তি হিসেবে কাজ করা সমুদ্রপথগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এখন তেহরান কাছাকাছি ও দূরের—দুই জায়গাতেই উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বার্তাটি হলো, শুধু হরমুজ নয়, বাব এল-মান্দেবও ঝুঁকিতে রয়েছে।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখানে বিপদের মূল বিষয়টি সর্বাত্মক যুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে যাওয়া নয়। বরং আসল ঝুঁকি হলো ধীর কিন্তু অব্যাহতভাবে সংঘাতের পরিধি বিস্তৃত হওয়া। এই প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষ সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়েই ক্রমাগত ঝুঁকি বাড়িয়ে চলেছে।

সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকি ওয়াশিংটন ও তেহরানের ওপর আবার আলোচনায় ফেরার চাপও বাড়াতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেল পরিবহনপথ সংঘাতের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আগেই এমন চাপ তৈরি হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আলোচক ডেনিস রস বলেন, ওয়াশিংটনের দৃষ্টিকোণ থেকে আসল প্রশ্ন হলো, ইরানের হিসাব-নিকাশ এমনভাবে কীভাবে বদলে দেওয়া যায়, যাতে তারা আবার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত হয়।

হুতিরা ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, তারা বাব এল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে।

তাদের ভাষ্য ছিল, ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

রয়টার্স জানায়, এই হামলার কারণে বড় বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান তাদের জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল করাতে বাধ্য হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। একইসঙ্গে জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বিমান হামলা চালায় এবং একটি বহুজাতিক নৌ অভিযান শুরু হয়।

কিংস কলেজ লন্ডনের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ হুতিদের সর্বশেষ হুমকিকে হরমুজের পর ইরানের জন্য ‘আরেকটি পারমাণবিক বিকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) যদি মনে করে সর্বাত্মক যুদ্ধে ফিরে যাওয়া অনিবার্য হয়ে উঠেছে, কেবল তখনই ইরান এই বিকল্প ব্যবহার করবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করলে তেহরান ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের ব্যবহার করে বাব এল-মান্দেব বন্ধ করে দিতে পারে। এতে হরমুজ প্রণালির কারণে ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ধাক্কা আরও তীব্র হবে।

সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের বলেন, বৃহত্তর কোনো সংঘাতের কারণে অঞ্চলটিকে বড় মূল্য দিতে হলেও উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমেই মনে করছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সীমায় পৌঁছে গেছে।

সাগের বলেন, ‘বিজয়ী ইরান এবং পরাজিত ইরান—দুটিরই এই অঞ্চলের জন্য পরিণতি রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশ হয়তো পরেরটির মূল্যকে তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করতে পারে, যদি এর ফলে আরও স্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ তৈরি হয়।’

তিনি বলেন, বাব এল-মান্দেব দিয়ে নৌ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা এখনো হুতিদের রয়েছে। তবে তেহরানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া তারা সংঘাত আরও বাড়াবে বলে মনে হয় না।

তিনি আরও বলেন, জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরিতে হুতিদের যেকোনো প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের অংশীদারদের আরও বড় সামরিক প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। ওই প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য হতে পারে গোষ্ঠীটির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান একাধিক দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments