মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের তেল ও বাণিজ্য পথ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় দুই মাস ধরে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রবেশের একমাত্র সমুদ্র পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে।
এ অবস্থায় আরব দেশগুলো তেহরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে রপ্তানি-বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে বিকল্প পথ খুঁজছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথ তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ হবে না।
আজ শুক্রবার বার্তাসংস্থা এএফপির বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে আসে কোন কোন বিকল্প পথের কথা ভাবছে উপসাগরীয় দেশগুলো! আর সেগুলো কতোটা বাস্তবসম্মত হবে!
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসা ও জনহিতকর কাজের বিশেষ দূত বদর জাফর সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো আর কখনোই একটি অনিশ্চিত প্রতিবেশীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত প্রণালির ওপর কৌশলগত নির্ভরশীলতায় ফিরে যাবে না।’
তিনি নতুন পাইপলাইন ও বন্দর নির্মাণের ওপর জোর দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই পরিকল্পনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের সমুদ্রসীমা শুধুমাত্র উপসাগরীয় অঞ্চলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। তাই সমুদ্রপথে তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।
তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু পাইপলাইন রয়েছে যা দিয়ে তারা প্রণালির বাইরের বন্দর থেকে সীমিত পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাঠাতে পারে।
এখন তারা এসব পাইপলাইনের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করাসহ নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।
এর বাস্তবভিত্তি কতখানি সে বিষয়ে প্যারিসভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের রবার্ট মোগিয়েলনিকি এএফপিকে বলেন, ‘নতুন পাইপলাইন তৈরি করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এ ধরনের অবকাঠামোতেও ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে কাতারের মতো দেশ হরমুজ প্রণালির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’
কাতারের গবেষণা সংস্থা ‘মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’ এর সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডারের মতে, বিকল্প তেল-গ্যাসের অবকাঠামো তৈরি করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘ট্রান্স-অ্যারাবিয়ান গ্যাস পাইপলাইনের ধারণাটি মাঝে মাঝে উত্থাপিত হলেও তা কখনো এগোয়নি।’
দূরত্ব, রাজনৈতিক জটিলতা ও খরচ হিসাব করলে এলএনজিবাহী ট্যাংকারের তুলনায় এই পাইপলাইন দিয়ে তেল-গ্যাস পরিবহনে লাভ কম বলে উল্লেখ করেন স্নাইডার।
উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান কন্টেইনার বন্দরগুলো মূলত এর দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। এর মধ্যে দুবাইয়ের জেবেল আলি অন্যতম।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল ও পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে ওমান ও সৌদি আরবের লোহিত সাগরে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেখান থেকে স্থলপথে পণ্য আনা হচ্ছে।
স্নাইডারের মতে, স্থলপথের সক্ষমতা সীমিত এবং খরচও অনেক বেশি।
স্থলপথে পণ্য পরিবহনের আরেকটি বিকল্প হলো রেলপথ।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি সদস্য দেশকে যুক্ত করে রেলপথ চালুর পরিকল্পনা নিলেও নানা কারণে তা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য হরমুজের আরেকটি বিকল্প হতে পারে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর।
২০২৩ সালে চালু হওয়া এ করিডোরের একটি লক্ষ্য ছিল রেল সংযোগ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ইউরোপ ও ভারতের নৌরুটকে যুক্ত করা। আর এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খাল দুটোই এড়িয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছে দেশগুলো।
এ বিষয়ে গবেষক ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, ‘এই প্রকল্পটি কাল্পনিক না হলেও অনেকখানি দুর্বল।’
এর আওতায় সৌদি আরবকে যুক্ত হতে হবে ইসরায়েলের সঙ্গে। যা এখনো অনিশ্চিত, কেননা সৌদি আরব এখন ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী নয়।
ইরান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো একজোট হয়ে বিকল্প পথ খুঁজলে আগামীতে নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের রবার্ট মোগিয়েলনিকি এএফপিকে বলেন, ‘প্রণালিকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এখন আঞ্চলিক সমন্বয় প্রকল্পগুলোকে কিছুটা গতি দিলেও, পরে এগুলোই গুরুতর অর্থনৈতিক বাধা হিসেবে কাজ করবে।’
একইসঙ্গে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বেশি মনোযোগী সরকারগুলোও চাপে পড়বে বলে সতর্ক করেন তিনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে শুধু তেল ও গ্যাস রপ্তানিই থামেনি। পর্যটন, অ্যালুমিনিয়াম ও সার উৎপাদনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যা আগামীতে সমন্বয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
বিশ্লেষক স্নাইডারের মতে, অতীতেও এ অঞ্চলে সংঘাত হয়েছে, তবে বড় কোনো ঐক্য তৈরি করতে পারেনি। বরং ‘প্রতিবেশীর ক্ষতি করে লাভ’—এমন নীতিতে বিশ্বাসী উপসাগরীয় দেশগুলোতে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের ধাক্কা অনেক বড় হলেও, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

