Wednesday, April 29, 2026
Homeআন্তর্জাতিকহরমুজে ট্রাম্পের নৌ-অবরোধে যেভাবে বিপাকে ভারত-চীন

হরমুজে ট্রাম্পের নৌ-অবরোধে যেভাবে বিপাকে ভারত-চীন

হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ কেবল ইরানকেই কোণঠাসা করছে না, বরং এশিয়ায় দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।

ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯৮ শতাংশই যায় চীনে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ সম্মেলনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি।

এমন সময়ে ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের এই ‘চরম চাপ প্রয়োগের নীতি’ বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সযত্নে গড়ে তোলা ভঙ্গুর সুসম্পর্ককে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির প্রতিবেদনে এসব জানানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বরাবরই কিছুটা জটিল। তবে বর্তমানে ভারত দেখছে যে, মার্কিন নীতিগুলো তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে উঠছে। জ্বালানি সংকটের ধাক্কার প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতেও দেখা দিয়েছে।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রশাসন বারবার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি সফল করতে বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চায়।

এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সাবেক মার্কিন বাণিজ্য আলোচক (ট্রেড নেগোশিয়েটর) ওয়েন্ডি কাটলার বলেন, ‘ইরান সংকট, বিশেষ করে এই নৌ-অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।’

উত্তেজনার লক্ষণগুলো এরইমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের নৌ-অবরোধ নিয়ে বেইজিং এতদিন বেশ সংযত থাকলেও মঙ্গলবার তাদের সুর কঠোর হয়েছে।

দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং বলেছেন, এটি কেবল ‘উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে।’

যুদ্ধের এক মাসেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর ট্রাম্প তার পরিচিত কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, বেইজিং যদি ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে চীনা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।

বেইজিং এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। মুখপাত্র জিয়াকুন একে ‘ভিত্তিহীন অপবাদ এবং বিদ্বেষমূলক যোগসূত্র’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন।

জিয়াকুন বলেন, ‘অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের যেকোনো মার্কিন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে চীন পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।’

এদিকে ভারত এক ভিন্ন ধরনের চাপের মুখোমুখি। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে দেশটি এই সংঘাতের অর্থনৈতিক নেতিবাচক প্রভাবের মুখে চরম অসহায় পরিস্থিতিএ পড়েছে।

সাত বছরের বিরতির পর চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারত ইরান থেকে তেল ও গ্যাস কেনা পুনরায় শুরু করে। মার্কিন প্রশাসনের একটি সাময়িক ছাড়ের আওতায় তেহরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই দিল্লি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিটের এক ফোনালাপ শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে দুই নেতার মধ্যে ‘ফলপ্রসূ মতবিনিময়’ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ভারত যত দ্রুত সম্ভব উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি ফিরিয়ে আনার পক্ষে।’

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেনেওয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিবিষয়ক উপদেষ্টা অর্পিত চতুর্বেদি বলেন, ‘ওয়াশিংটন যদি ভারতের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধাও দেয়, তবুও তা দিল্লির মোট জ্বালানি চাহিদার সবটুকু মেটাতে পারবে না।’

চতুর্বেদি বলেন, মার্কিন নৌ-অবরোধ জোরদার হতে থাকায় ভারত সম্ভবত ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করে দেবে; তা না হলে ‘আমরা দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে দেখব।’

চতুর্বেদি আরও যোগ করেন, আপাতত ‘ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ককে আর কোনো ঝুঁকিতে ফেলার কিংবা একে এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ভারতের নেই, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব হবে না।’

সংকট মোকাবিলা

জ্বালানি সংকটের এই ধাক্কা এশিয়ার দুই প্রধান অর্থনীতির দেশে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অনুভূত হচ্ছে। তেলের বিশাল মজুত এবং জ্বালানির বহুমুখী উৎসের কারণে চীন অন্যান্য শক্তিশালী অর্থনীতির তুলনায় বেশ স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে।

এমনকি সমুদ্রপথে থাকা ইরানের তেলের প্রায় ৯৮ শতাংশই চীনের দিকে যাচ্ছে, যা তেহরানের তেল বাণিজ্যের মজবুত ভিত্তিরই বহিপ্রকাশ।

ইউরেশিয়া গ্রুপের ড্যান ওয়াংয়ের মতে, ট্রানজিটে থাকা তেলসহ চীনের বর্তমান মজুত ১২০ দিনের বেশি চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ইরান থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও চীন কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে বা অন্য দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে।

এদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনকে ‘অনির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তার মতে, বৈশ্বিক সংকট দূর করতে সাহায্য না করে বেইজিং উল্টো তেল মজুত করছে।

চীনের বিপরীতে ভারতের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। ভারতের কোনো মজুত সুরক্ষা নেই। জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিট তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ভারত এই অবরোধের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তেলের মজুত যেখানে ৬০ দিনেরও কম, সেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে নয়াদিল্লিকে চরম সংকটে পড়তে হবে।

বিশেষ করে রান্নার গ্যাস বা এলপিজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সুমেধা দাশগুপ্তের মতে, ভারতের কোনো শক্তিশালী এলপিজি রিজার্ভ নেই; আমদানি বন্ধ হলে মজুত থাকা গ্যাসে বড়জোর দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলবে। ভারতের এলপিজি চাহিদার ৬৬ শতাংশই পূরণ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

ভুল হিসাবের ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং বা নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে এমন কোনো কঠোর পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটাতে পারে।

ওয়াংয়ের মতে, এই নৌ-অবরোধটি একতরফা নয়, বরং এটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি তেলের সব ক্রেতার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি বলেন, বেইজিং বড়জোর কূটনৈতিক স্তরে প্রতিবাদ জানাবে; তবে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া তারা দেখাবে না বলেই মনে হয়।

এদিকে চতুর্বেদি জানান, ওয়াশিংটনের দেওয়া ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারত সম্ভবত ইরান থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে দেবে। এর বদলে তারা রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকবে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘মোদি সম্ভবত ট্রাম্পের টেনে দেওয়া কোনো রেড লাইন বা সীমারেখা অতিক্রম করবেন না।’

তবে সমুদ্রে যেকোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপ বা সরাসরি সংঘাত এই কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে দ্রুত নাটকীয় মোড় দিতে পারে। এটি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সযত্নে গড়া সম্পর্কের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক প্রধান ডেভিড মিলে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের কোনো জাহাজ পথরোধ বা আটক করে, তবে সেটি একটি বড় সংঘাতের জন্ম দেবে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোকেই তাদের সম্মানের লড়াই হিসেবে দেখবে।

আর এমনটা হলে দুই দেশের সম্পর্ক বর্তমানের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এক সংঘাতময় পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments