Friday, July 24, 2026
Home‘হুমায়ুন স্যার বলেছিলেন, ডাক্তারের ইলিশ মাছ কেনার হাত খুব ভালো’

‘হুমায়ুন স্যার বলেছিলেন, ডাক্তারের ইলিশ মাছ কেনার হাত খুব ভালো’

অভিনয়ের পাশাপাশি চিকিৎসক হিসেবেও পরিচিত ডা. এজাজুল ইসলাম। নাটক ও চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে হুমায়ূন আহমেদের পরিচয় বহু বছরের। সেই সূত্রে তার অসংখ্য নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। শিল্পীজীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও দুজনের ছিল আন্তরিক সম্পর্ক।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে কিছু স্মৃতির কথা তুলে ধরেন ডা. এজাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ ইলিশ মাছ ও শিং মাছ খুব পছন্দ করতেন। বিষয়টি তিনি ভালোভাবেই জানতেন। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর অল্প কয়েকদিনের জন্য দেশে ফিরেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তখন তাকে দেখতে নুহাশ পল্লীতে যান এজাজুল ইসলাম। যাওয়ার আগে বাজার থেকে নিজের পছন্দে কয়েকটি ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে যান। তবে মাছগুলো যে তিনি এনেছেন, সেটি হুমায়ূন আহমেদকে জানাননি।

তিনি বলেন, ‘মাছ কিনে বাসায় এনে মাথা আর লেজ কেটে বাকি অংশ টুকরো করে নিয়েছিলাম। এরপর ব্যাগে করে নুহাশপল্লীতে নিয়ে বাবুর্চির হাতে দিয়ে দিই। কিন্তু স্যারকে বলিনি যে মাছগুলো আমি এনেছি।’

সেদিন দেখা হওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ নিজের কিছু চিকিৎসা-সংক্রান্ত রিপোর্ট তার হাতে তুলে দেন।

‘‘স্যার বললেন, ‘ডাক্তার, রিপোর্টগুলো দেখো তো। আমি বাঁচব কিনা বলো?”’

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যে কত কঠিন ছিল, সেটিও অকপটে স্বীকার করেন এজাজুল ইসলাম।

‘আমরা তো তখন প্রায় ধরেই নিয়েছিলাম, স্যারকে আর বেশি দিন পাওয়া যাবে না। বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্যানসার হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে, অথচ তিনি আমাকে রিপোর্ট দেখতে বলছেন। আমি কিছু বলতে পারিনি। শুধু মনে মনে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলাম—অলৌকিক অনেক কিছুই তো ঘটে, আমার স্যার যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।’

এর কিছুক্ষণ পর হুমায়ূন আহমেদের মা-ও তাকে একই প্রশ্ন করেন।

‘‘খালাম্মা বললেন, ‘তুমি বলো তো, হুমায়ূন বাঁচবে?” আমি বলেছিলাম, “জি, খালাম্মা, স্যার বাঁচবেন।” তখন তিনি বললেন, “কেন মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছ?” এরপর আর কোনো কথা বলতে পারিনি।’

সেদিন দুপুরে রান্না হয়েছিল সেই ইলিশ মাছ।

‘‘খেতে খেতে হুমায়ূন আহমেদ জানতে চান, মাছগুলো কে এনেছে। পরে যখন জানতে পারেন, এজাজুল ইসলাম কিনে এনেছেন, তখন হাসিমুখে বলেন, ‘ডাক্তার ইলিশ মাছ ভালো কিনতে পারে। ডাক্তারের হাত ভালো। সবাই এমন মাছ কিনতে পারে না।’’’

আরেক দিন নুহাশপল্লীতে তাকে দেখতে গেলে অনেক মানুষের ভিড় ছিল। সেদিন হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়।

‘‘স্যার শুধু বলেছিলেন, ‘ডাক্তার, নাস্তা করো।’ এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা।’’

ইলিশ মাছকে ঘিরে আরেকটি স্মৃতিও ভাগ করে নেন এজাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘‘অনেক বছর আগে শিলা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কিছুই খেতে পারছিল না। তখন স্যার আমাকে ফোন করে সব বললেন। পরে শিলাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কী খেতে চাও?’ শিলা বলেছিল, ‘ইলিশ মাছ।’ কথাটা শোনার পর আমি বাজার থেকে ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে যাই। সেই মাছ রান্না হওয়ার পর শিলা কিছুটা খেতে পেরেছিল।’’

সেদিনও হুমায়ূন আহমেদ একই কথা বলেছিলেন।

‘ডাক্তারের ইলিশ মাছ কেনার হাত খুব ভালো। সবাই কিন্তু ভালো মাছ চিনতে পারে না।’

শুধু ইলিশ নয়, হুমায়ূন আহমেদের জন্য নিয়মিত শিং মাছও কিনে নিয়ে যেতেন এজাজুল ইসলাম। তবে সেটিও তিনি কখনো জানাতে চাইতেন না।

হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, ‘মাছ নিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার অনেক গল্প আছে।’

স্মৃতিচারণের শেষ দিকে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে।

‘স্যারের চলে যাওয়ার পর এসব গল্প বারবার মনে পড়ে। তিনি যেখানে আছেন, ভালো থাকুন। মহান আল্লাহ তার আত্মার শান্তি দান করুন।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments