Wednesday, April 29, 2026
Homeঅর্থনীতিবাড়তি খরচে বিপর্যস্ত নিম্নআয়ের মানুষের সংসার

বাড়তি খরচে বিপর্যস্ত নিম্নআয়ের মানুষের সংসার

শুক্রবার ভরদুপুরের তপ্ত রোদে রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁওয়ের একটি সবজির দোকানে বেগুনের দরদাম করছিলেন শাহনাজ আক্তার। বৈশাখের তীব্র গরমে কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল তার। পরনের শাড়ির রংও অনেকটা মলিন।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ৪০০ টাকা দিয়ে তার ছয় সদস্যের পরিবারের দৈনন্দিন বাজার হয়ে যেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতির এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে, রান্নার তেল ছাড়াই তাকে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

মৃদুস্বরে কথা বলছিলেন তিনি, যা বাজারের শোরগোলে যা প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না। ৩৫ বছর বয়সী শাহনাজ বলেন, ‘তেল ছাড়া তো আর রান্না করা সম্ভব না।’

শাহনাজের স্বামী পেশায় অটোরিকশাচালক। কয়েক সপ্তাহ আগেও তাদের সংসারের বাজার খরচ মেটাতে ধার করতে হতো না। এখন হয় তাদের স্থানীয় দোকান থেকে বাকিতে কেনাকাটা করতে হচ্ছে, না হয় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম কিনতে হচ্ছে।

শাহনাজ বর্তমানে গৃহকর্মীর কাজ খুঁজছেন, কিন্তু এখনো কোনো কাজ জোটেনি। তিনি জানান, কাজ না পেলে সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকবে না।

শাহনাজের এই সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত তিন বছরে দফায় দফায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। একটির ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আসছে অন্যটি। মানুষের আয়ের তুলনায় খরচ এতটাই বেড়েছে যে, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে উপার্জনের কোনো সামঞ্জস্য থাকছে না।

হিসাব-নিকাশ করলেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়। মার্চ মাসেও মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ শতাংশ, যা উচ্চমূল্যের ধারাবাহিকতাকেই তুলে ধরছে। আর এই বাড়তি খরচের বোঝা সরাসরি মানুষের সংসারের আয়ে টান দিচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, টানা ৫০ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি। মার্চ মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।

বাস্তবে এর অর্থ হলো মানুষের ‘প্রকৃত আয়’ এখন ঋণাত্মক। শ্রমিকদের বেতন বা আয় কাগজে-কলমে বাড়লেও ক্রমাগত বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা আসলে দিনে দিনে কমেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, শ্রমিকেরা উভয় দিক থেকে চাপের মুখে আছেন। একদিকে যেমন পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির গতিও মন্থর হয়ে পড়েছে।

বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারের দিক থেকে এলো নতুন আরেকটি বড় ধাক্কা। গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালয় তেলের দাম বাড়িয়ে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গড়ে সব ক্ষেত্রেই দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। আর এর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনও (বিইআরসি) বাড়িয়ে দিয়েছে এলপিজি গ্যাসের দাম।

অতীতের প্রবণতা বলছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যের দাম আরও বেশি হারে বেড়ে যায়। এলপিজির দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর সেই চাপকে আরও অসহনীয় করে তুলবে।

বেসরকারি প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানের কর্মী রেজানুর রহমান রিফাতের সামনে এখন এক নির্মম হিসাব। মুহূর্তের মধ্যেই জ্বালানি খরচ ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে, অথচ আগামী বছরের আগে বেতন বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে দৈনন্দিন খরচের কোথাও না কোথাও তাকে বড় ধরনের কাটছাঁট করতেই হবে।

এক সন্তানের জনক ৩১ বছর বয়সী রিফাত এখন খরচ কমাবেন এবং সঞ্চয় কমিয়ে এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। স্ত্রী চাকরি করলেও দুজনের আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বৃদ্ধ মা-বাবাও রিফাতের সংসারের অংশ।

রিফাতের চিন্তা তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। প্রতি মাসে সঞ্চয়ের জন্য তিনি যে অর্থ আলাদা করে রাখতেন, তা এখন কমে আসবে; যার ফলে মাত্র এক সপ্তাহ আগের তুলনায় তার আর্থিক ভবিষ্যৎ এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সুদূরপ্রসারী; এটি পরিবহন, দেশীয় শিল্প, রপ্তানিমুখী খাত এবং আমদানি বিকল্প শিল্প—সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন ও পরিচালন খরচ বাড়িয়ে দেয়। পরিশেষে এই বাড়তি খরচ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকেই উসকে দেয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে এড়ানো সম্ভব হয় না।

তিনি উল্লেখ করেন, কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর এই নতুন দরবৃদ্ধি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করবে—বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন অনেক পরিবারের আর নতুন করে ছাড় দেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমলে সরকার দেশেও দাম সমন্বয় করবে। তবে নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সাবধানী মন্তব্য করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো অনেকাংশেই অনিবার্য।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শহরের বাজারগুলোতে এরইমধ্যে দৃশ্যমান। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মোশাররফ হোসেন জানান, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং কিছু সবজির মৌসুম শেষ হয়ে আসায় গত মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি সবজির দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সরকারি সংস্থা টিসিবির বাজারদরের তথ্যেও এই অস্বস্তিকর চিত্র ফুটে উঠেছে। এক সপ্তাহ আগে যে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫২ দশমিক ৫ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তার দাম ৫৭ দশমিক ৫ টাকা। এ ছাড়া আটার দাম ২ শতাংশ, রসুনের ২ শতাংশ, আদার ১৩ শতাংশ, দারুচিনির ১০ শতাংশ এবং কাঁচামরিচের দাম একলাফে ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

কল্যাণপুর নিউ মার্কেটের পাশে ফল বিক্রেতা কামাল হোসেন জানান, তার সন্তানরা মাঝেমধ্যেই মুরগির মাংস খেতে চায়। কিন্তু সোনালি মুরগি কেনার সামর্থ্য এখন আর নেই, তাই তিনি ব্রয়লার মুরগি কেনেন। চালের দামও বেড়েছে। আগে তিনি পাঙাশ মাছ এড়িয়ে চলতেন, যা ছিল তার কাছে খাবারের সবশেষ বিকল্প। এখন আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই তিনি পাঙাশ মাছ কিনছেন।

ইব্রাহিমপুর বাজারের ছোট একটি ভাতের হোটেলের মালিক সাজেদুর রহমান। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তার দৈনিক সবজি কেনার বাজেট ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার টাকায় ঠেকেছে। কেজিপ্রতি  ১৭০ টাকার পাম অয়েল এখন ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লোকসান সামলাতে তিনি খাবারের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছেন, তবে তার ভয়—দাম বাড়ালে যদি গ্রাহকেরা আসা বন্ধ করে দেয়।

সাধারণ মানুষের জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলোই বলে দেয় দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি পারিবারিক বা সাংসারিক পর্যায়ে কতটা ভয়াবহ হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ সাধারণত প্রথমে বিনোদন বা পোশাকের মতো খাদ্যবহির্ভূত খরচগুলো কমিয়ে দেয়। তাতেও সংকুলান না হলে তারা খাবার খাওয়া কমিয়ে দেয়; সবশেষে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিয়ে কমদামি ও নিম্নমানের খাবার বেছে নিতে বাধ্য হয়।

এই প্রক্রিয়া এত ধীরে ঘটে যে অনেকের নজর এড়িয়ে যায়। কিন্তু, মাঝরাতে হুট করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির মতো কোনো ঘটনা এই পুরো দৃশ্যপটকে এক নিমিষেই সামনে নিয়ে আসে।

গত এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন, ইরান ইস্যুতে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে আরও ১২ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার (দৈনিক ৩ ডলারের কম আয়) নিচে অবস্থান করবে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এই সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের সংকট, সরকারি নীতি গ্রহণের সীমিত সুযোগ এবং আস্থার সংকটের মতো বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও ঘনীভূত করবে।

২০২২ সালের শুরুতে ডলারের বিপরীতে ৮৫ টাকার সেই স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশীয় মুদ্রার মান কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। মুদ্রার এই অবমূল্যায়নের কারণে জ্বালানি ও ভোজ্যতেলসহ প্রতিটি আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাজারে আসার আগেই চড়া হয়ে যাচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, গত তিন বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং মধ্যবিত্তরা নীরবে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে নেমে যাচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এবং উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের ওপর বাড়তে থাকা খরচের চাপে তাদের জীবনযাত্রা সংকুচিত হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, মানুষ এখন আগের চেয়ে সস্তা খাবার খাচ্ছে, তবে সমস্যাটা শুধু টাকার নয়। যখন একটি পরিবারকে বাধ্য হয়ে টানা কম এবং নিম্নমানের খাবার খেতে হয়, তখন বাচ্চাদের মেধা ও শরীর ঠিকমতো বাড়ে না। তেলের দামের হিসাব যেভাবে করা যায়, এই ক্ষতির হিসাব করা হয়তো ততটা সহজ নয়, কিন্তু এই বিপদ খুবই বাস্তব।

পশ্চিম আগারগাঁওয়ে শাহনাজ আক্তার এখনও কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তার কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা নিশ্চয়তা নেই। তিন মাস আগেও তিনি যেভাবে সংসার সামলাতে পারতেন, আজ আর তা পারছেন না—আর কোনো কিছুই এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে না যে সামনের সপ্তাহটি তার জন্য সহজ হবে।

আবার পশ্চিম আগারগাঁওয়ে ফেরা যাক। শাহনাজ আক্তার কাজের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু কবে কাজ পাবেন তার কোনো ঠিক নেই। তিন মাস আগে তিনি যেভাবে চলতে পারতেন, আজ আর সেভাবে পারছেন না। আর সামনের দিনগুলোতে অবস্থা যে আরও ভালো হবে, এমন কোনো আশাও তিনি দেখছেন না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments