Wednesday, April 29, 2026
Homeসারাদেশ‘আমরা তোমাকে কিনে এনেছি, যেতে চাইলে ১৫০০ রিয়াল দাও’

‘আমরা তোমাকে কিনে এনেছি, যেতে চাইলে ১৫০০ রিয়াল দাও’

স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর দুই সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে রহিমা (ছদ্মনাম) দালালের দেওয়া সৌদি আরবে চাকরির প্রস্তাবকে বেঁচে থাকার অবলম্বন মনে করেছিলেন।

২০২০ সালে মাসে ১ হাজার ৪০০ রিয়াল (প্রায় ৪৬ হাজার টাকা) বেতনে ‘অফিস জবের’ প্রতিশ্রুতি পেয়ে তিনি নরসিংদী থেকে সৌদি আরবে যান। কিন্তু রিয়াদে পৌঁছানোর পর তাকে কোনো অফিসে নেওয়া হয়নি। এর বদলে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এক বিশাল প্রাসাদে, যেখানে তাকে মাসে ১ হাজার ১০০ রিয়াল (প্রায় ৩৬ হাজার টাকা) বেতনে কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হতো।

৪০ বছর বয়সী রহিমা বলেন, ‘আমি প্রতিদিন রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতাম। একটু বিশ্রাম নিলেই গৃহকর্ত্রী আমাকে চিৎকার করে গালিগালাজ করতেন।’ নিয়োগকর্তা তাকে খুব সামান্য খাবার দিতেন, অনেক সময় বেঁচে যাওয়া উচ্ছিষ্ট খেয়ে দিন কাটাতে হতো তাকে।

রহিমা তার যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘একদিন ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে আমি বাইরে থেকে খাবার কিনে আনি। তারা জানতে পেরে আমাকে নির্দয়ভাবে মারধর করে এবং এক সপ্তাহ তালাবদ্ধ করে রাখে। তখন আমাকে প্রায় না খেয়েই থাকতে হয়েছিল।’

এর কয়েকদিন পর পর্দা পরিষ্কার করতে গিয়ে উঁচু টুল থেকে পড়ে রহিমার পা জখম হয় এবং ঠোঁট কেটে যায়। কিন্তু তার মালিক তাকে কোনো চিকিৎসা না দিয়ে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ খাইয়ে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করেন। 

অবস্থা আরও খারাপ হলে দেশে ফেরার আকুতি জানান রহিমা। তখন নিয়োগকর্তা তাকে রিক্রুটিং এজেন্টের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। সেই এজেন্ট তাকে সাফ জানিয়ে দেয়, ‘আমরা তোমাকে কিনে এনেছি, যেতে চাইলে ১ হাজার ৫০০ রিয়াল দিতে হবে।’

টাকা দিতে না পারায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই কয়েক মাস তাকে কাজ করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে বিধ্বস্ত রহিমা বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং ২০২৩ সালে দেশে ফেরেন। তবে শেষ দুই মাসের বেতন তিনি পাননি।

রহিমা বলেন, ‘দূতাবাসের সেফ হোমে আমাকে তিন দিন রাখা হয়েছিল। মালিক টিকিটের টাকা দেওয়ায় তারা আমাকে দ্রুত চলে আসতে বলে।’

রহিমার এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং বিদেশে নারী শ্রমিকদের ওপর চলা কাঠামোগত নির্যাতনের একটি বিস্তৃত চিত্র মাত্র। 

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কাছে নির্যাতিত নারী শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে অন্তত ৬৯ হাজার ৯০ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতন, খাদ্যাভাব, বকেয়া বেতন ও অতিরিক্ত কাজের চাপের শিকার হয়েছেন।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়নেরও বেশি বাংলাদেশি নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ গিয়েছেন, যার সিংহভাগই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের (ডব্লিউইডব্লিউবি) তথ্যমতে, গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। অধিকাংশ মৃত্যুসনদেই আত্মহত্যার কথা উল্লেখ ছিল।

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিএমইটিতে ২ হাজার ৩৬টি অভিযোগ জমা দিয়েছেন নারী শ্রমিকরা। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৬৯টি অভিযোগ ‘নিষ্পত্তি’ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর শাস্তি হওয়ার নজির হাতেগোনা। উদাহরণস্বরূপ গত বছর ১১০টি এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও মাত্র ১৪টি এজেন্সিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযোগগুলো অনেক সময় প্রশাসনিক জটিলতা বা প্রমাণের অভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করেন, তারা প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থাকেন। তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশের মিশনগুলো থেকে মোট ৩৯৫ জন অভিবাসী শ্রমিক আইনি সহায়তা পেয়েছেন, যার মধ্যে নারী মাত্র ১১ জন। এই মামলাগুলোর বেশিরভাগই ছিল নিয়োগকর্তা বা বিদেশি কর্তৃপক্ষের করা হয়রানিমূলক অভিযোগে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মামুন উর রশিদ বলেন, রাষ্ট্র যখন কেবল রেমিট্যান্সের পরিমাণের ওপর নজর দেয়, তখন তারা ভুলে যায় যে এই মানুষগুলোরও অধিকার আছে। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারদের মতো উচ্চপদস্থ কর্মীরা আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী সুরক্ষা পেলেও সাধারণ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা হয় না। 

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ভুক্তভোগী নারী শ্রমিকরা পালিয়ে আসার চেষ্টা করলে মালিকরা প্রায়ই তাদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা দেয়। ফলে দূতাবাসগুলো ন্যায়বিচারের চেয়ে তাদের দেশে পাঠানোকেই অগ্রাধিকার দেয়।

তিনি আরও যোগ করেন, অন্য দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে নিয়মিত ফলোআপ সিস্টেম নেই। নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে হয়তো এই নির্যাতন শুরুতেই ঠেকানো যেত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সরকারের ‘নতি স্বীকারমূলক কূটনীতি’র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আমাদের নীতি হলো— যেভাবে পারো যাও, যেকোনো কাজ করো এবং ডলার পাঠাও। এটি একটি রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে না।

তবে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নূর জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি বলেন, আগে বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে আসা নারী শ্রমিকদের আইনি সহায়তার কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না। আমরা এখন সৌদি আরবে দুটি ল ফার্ম নিয়োগ করেছি যাতে শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার পেতে পারেন। এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে নতুন গ্রেডিং সিস্টেম চালু করার কথাও তিনি জানান।

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments