Sunday, May 3, 2026
Homeআন্তর্জাতিকফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ কেন আলোচনায়, এটির মালিক কে?

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ কেন আলোচনায়, এটির মালিক কে?

ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে। সম্প্রতি এই দাবি ঘিরে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই তীব্র বক্তব্য দিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাইলেইয়ের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।

ট্রাম্প ও মাইলেই একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন। আর্জেন্টিনার এই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পপন্থী রক্ষণশীল রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। ট্রাম্প এর আগে মাইলেইকে তার ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন।

এই ঘটনা প্রবাহের মধ্যেই, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন এপ্রিলে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের (আর্জেন্টিনায় যা ‘ইসলাস মালভিনাস’ নামে পরিচিত) সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে আসে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি ফাঁস হওয়া নথিতে দ্বীপগুলোর ওপর ব্রিটেনের মালিকানাকে নতুন করে বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। স্পষ্টতই এই প্রস্তাবের পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাজ্যের অসহযোগিতা কাজ করেছে।

বিবিসি জানায়, নথিটি প্রকাশ্যে আসার কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাজ্য দ্বীপগুলোর সম্পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করে বিবৃতি দেয়।

তবে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মাইলেই সামাজিকমাধ্যম এক্সে পোস্ট করে বলেন, দ্বীপগুলো সবসময়ই আর্জেন্টিনার ‘ছিল, আছে এবং থাকবে’।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচনা শুরু হওয়ার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওই নথিগুলোর গুরুত্বকে খাটো করে দেখান। তিনি বলেন, দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।

দ্বীপগুলোর ওপর যুক্তরাজ্যের দাবি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। আবার দ্বীপগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক সংযোগের ওপর ভিত্তি করে আর্জেন্টিনারও নিজস্ব দাবি রয়েছে। তাদের ভাষ্য, স্পেন সম্রাজ্য থেকে প্রাপ্ত উপনিবেশিক ভূখণ্ডের অংশ ফকল্যান্ড। কিন্তু উনিশ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটেন জোরপূর্বক দ্বীপগুলোকে ছিনিয়ে নিয়েছিল।

তাই প্রশ্ন উঠেছে—ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে কী বিরোধ? এর প্রকৃত মালিক কে? আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউস, সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও রয়টার্স।

দ্বীপগুলো শুরুতে জনশূন্য ছিল। এই ভূখণ্ডের ওপর কোনো দেশের দাবিও ছিল না। অর্থাৎ, আবিষ্কারের পর যেকোনো রাষ্ট্র আইনগতভাবে এগুলোর দখল নিতে পারত।

তবে স্পেন দাবি করে, ১৪৯৩ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম আমেরিকায় পৌঁছানোর এক বছর পর ক্যাথলিক চার্চের পোপ ‘ইন্টার ক্যাটেরা’ পাপাল আদালতের মাধ্যমে আইন জারি করে দ্বীপগুলো মাদ্রিদের অধীনে প্রদান করেছিলেন।

ওই আইনের মাধ্যমে দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ আজোরেসের পশ্চিম ও দক্ষিণে সব ভূখণ্ড স্পেনকে দেওয়া হয়। এদিকে পর্তুগালের বিপরীত দাবিকে বাদ দেওয়া হয়। আফ্রিকার উপকূলে মনোনিবেশ করায় তারা আর এদিকে মাথাও ঘামায়নি।

এরপর ১৪৯৪ সালের টরডেসিয়াস চুক্তির মাধ্যমে স্পেন ও পর্তুগাল—উভয় রাষ্ট্রই পোপের আইন অনুমোদন করে।

তবে অন্যান্য রাষ্ট্র এতে অংশ না নেওয়ায় এই পাপাল আদেশ চুক্তিকে মেনে নেয়নি। তারা নিজেদের মতো দ্বীপগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে যায়।

১৫৯০ সালে প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে ব্রিটিশ নাগরিক জন ডেভিস দ্বীপগুলো দেখার কৃতিত্ব পেয়ে থাকেন। তবে প্রায় ১০ বছর পর ডাচ ক্যাপ্টেন সেবাল্ড ডি উইয়ার্ডট সেখান থেকে প্রথম নির্ভরযোগ্য আবিষ্কারের নথি তৈরি করেন। আর ১৬৯০ সালে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন স্ট্রং প্রথম নিশ্চিতভাবে সেখানে অবতরণ করেন। এরপর থেকেই ব্রিটেন দ্বীপগুলোর মালিকানার দাবি করে আসছে।

তবে কোনো সৈকতে পতাকা স্থাপন করলেই পূর্ণ মালিকানা পাওয়া যায় না। এর পরবর্তী ধাপে ‘রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের শান্তিপূর্ণ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রদর্শন’ নিশ্চিত করতে হয়। সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

বাস্তবে ১৭৬৪ সালে ফরাসিরাই পূর্বাঞ্চলীয় দ্বীপে প্রথম বসতি স্থাপন করে। অল্প কিছুদিন পর ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুই সেই দ্বীপগুলোর ওপর মালিকানা দাবি করে বসেন।

ব্রিটিশরা প্রথমে ফরাসি বসতির বিষয়ে অবগত ছিল না এবং এক বছর পর সন্ডার্স দ্বীপের পোর্ট এগমন্টে নিজেদের বসতি স্থাপন করে। এদিকে স্পেন তার পাপাল দাবির ভিত্তিতে ফরাসিদের প্রায় ৬ লাখ লিভ্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরে যেতে রাজি করায়।

১৭৭০ সালে স্প্যানিশরা দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট এগমন্টে ব্রিটিশ বসতি সরিয়ে দেয়। তবে এই নিয়ে যুদ্ধ এড়াতে একটি চুক্তি করা হয়। চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষের আইনি দাবিকে অক্ষুণ্ণ রেখে বসতিটি নতুন করে স্থাপন করা হয়।

১৭৭৪ সালের মধ্যে দ্বীপগুলো থেকে সরাসরি তাদের প্রশাসন প্রত্যাহার করে লন্ডন। তবে এই ঘটনা যাতে ব্রিটিশদের দাবি ছেড়ে দেওয়া হিসেবে দেখা না হয়, সেজন্য তাদের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে একটি ফলক রেখে দেওয়া হয়।

১৮১০ সালে শুরু হওয়া লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে স্পেনও দ্বীপগুলো থেকে সরে যায়। এদিকে তারাও দাবি বজায় রাখতে একটি ফলক রেখে যায়। তবে মাদ্রিদ আর কখনোই দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়নি।

রিও দে লা প্লাতার ইউনাইটেড প্রভিন্সেস নামে একটি দেশ ১৮১৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এটিই পরে আর্জেন্টিনার মূল ভূখণ্ড হয়ে ওঠে। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রশ্নে কোনো পক্ষপাত ছাড়াই ১৮২৫ সালে যুক্তরাজ্যও দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়।

স্বাধীনতার পর দ্বীপগুলোতে কিছু সময়ের জন্য আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২৯ সালে আর্জেন্টিনা একজন গভর্নর পাঠালে লন্ডন প্রতিবাদ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজ নিয়ে জটিলতার পর ১৮৩১ সালে ইউএসএস লেক্সিংটন পাঠানো হয়, যা দ্বীপগুলো থেকে আর্জেন্টাইন কর্তৃত্ব সরিয়ে দেয়। ১৮৩৩ সালে যুক্তরাজ্য পুনরায় সেখানে প্রশাসন চালু করে।

আর্জেন্টিনা দাবি করে, তখনই দ্বীপগুলোর ওপর তাদের মালিকানা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। স্পেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আমেরিকায় প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনতার সময় সাবেক উপনিবেশিক শক্তির সীমানাও উত্তরাধিকার সূত্রে পেত।

আর্জেন্টিনার মতে, এর মধ্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (ইসলাস মালভিনাস) অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তাই আর্জেন্টিনার দাবি, ব্রিটিশরা শক্তি প্রয়োগ করে তাদের প্রশাসন ও বসতি স্থাপনকারীদের উচ্ছেদ করে তাদের ভূখণ্ড থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত করেছিল।

যুক্তরাজ্য পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলে, স্পেনের অধীনে না থাকা কোনো ভূখণ্ড আর্জেন্টিনা উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে পারে না। কারণ যুক্তরাজ্য শুরু থেকেই স্পেনের পাল্টা দাবির বিরোধিতা করেছে। তাছাড়া, আর্জেন্টিনা কোনো দীর্ঘ সময়ের জন্য দ্বীপগুলোতে কার্যকর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

বিপরীতে, যুক্তরাজ্য ১৮৩৩ সাল থেকে প্রায় ২০০ বছর ধরে দ্বীপগুলোতে ‘রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের শান্তিপূর্ণ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রদর্শন’ করে আসছে।

আর্জেন্টিনা দাবি করে, তারা ধারাবাহিকভাবে ব্রিটিশদের জোরপূর্বক দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে আর্জেন্টিনা কয়েক দশক ধরে কোনো প্রতিবাদ না করে ১৮৮৫ সালে আবারও দাবি জোরালো করার চেষ্টা করে। তখনো যুক্তরাজ্যের দাবি সন্দেহজনক থাকলেও দীর্ঘ সময়ের নিরবচ্ছিন্ন দখল ব্রিটিশ মালিকানাকে দৃঢ় করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

আত্মনিয়ন্ত্রণ আইন হলো আন্তর্জাতিক আইনের একটি মৌলিক নীতি। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা জাতি নিজেদের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের পথ বেছে নেওয়ার অধিকার পায়। উপনিবেশিক জয় বা দখলের ভিত্তিতে গঠিত যেকোনো মালিকানাকে গ্রহণ না করার অধিকার এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

এদিকে ‘উতি পসিদেতিস’ নীতিমালা অনুযায়ী, জনগণ উপনিবেশিক শক্তির নির্ধারিত সীমানার মধ্যেই তাদের অধিকার প্রয়োগ করে। তবে এই নীতির ভিত্তিতে দ্বীপগুলোর ওপর আর্জেন্টিনার দাবি প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। কারণ ১৮১৬ সালে যখন আর্জেন্টিনা স্বাধীন হয়, তখন ওই দ্বীপটি ব্রিটিশ মালিকানার অধীনে ছিল।

‘উতি পসিদেতিস’ হলো আন্তর্জাতিক আইনের একটি নীতি। যার অর্থ হলো—কোনো ভূখণ্ড যেভাবে আপনার (সংশ্লিষ্ট দেশের) দখলে আছে, সেভাবেই থাকবে। মূলত যুদ্ধ বা উপনিবেশিক শাসন শেষ হওয়ার পর কোনো দেশের সীমান্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই নীতিটি প্রয়োগ করা হয়।

এই নীতিটি সেসময়ে বাধ্যতামূলক না হলেও লাতিন আমেরিকার সুবিধার জন্য প্রয়োগ করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এটি ওই অঞ্চলে বাধ্যতামূলক আইনি মর্যাদা পায় এবং ১৯৬০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়।

‘উতি পসিদেতিস’ নীতিটি ইউনাইটেড প্রভিন্সেসের (আর্জেন্টিনা) ক্ষেত্রে প্রযোয্য হলেও যুক্তরাজ্যের জন্য নয়। কারণ যুক্তরাজ্য এই আন্তঃআমেরিকান চর্চার অংশ ছিল না।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার পর থেকে তাদের জনগণ পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণ যেহেতু পাল্টা মালিকানাকে অগ্রাহ্য করে, তাই ঐতিহাসিক এই অন্যায় সংশোধনের জন্য যুক্তরাজ্যের এখন দ্বীপগুলো ছেড়ে দেওয়া উচিত।

তবে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমত, ইউনাইটেড প্রভিন্সেস বা আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার সময় স্পেনের ওই ভূখণ্ডের ওপর মালিকানা সন্দেহজনক ছিল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আর্জেন্টিনা নিজেই এই যুক্তি দেয়নি। যদিও একই রকমের একটি যুক্তি মরিশাস চাগোস দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রে সফলভাবে কাজ করেছিল। সেখানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) রায় দেয়, মরিশাসকে স্বাধীনতা দেওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাজ্য তার উপনিবেশিক ভূখণ্ড থেকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ বিচ্ছিন্ন করেছিল। ফলে উপনিবেশিক সীমানার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি।

পার্থক্য হলো, আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার সময়ই ব্রিটেন ইতোমধ্যে দ্বীপগুলোর ওপর মালিকানা ধরে রেখেছিল। ফলে স্বাধীনতা দেওয়ার আগে ব্রিটেন উপনিবেশের কোনো অংশ বিচ্ছিন্ন করেনি। আর আর্জেন্টিনা ছিল স্পেনের উপনিবেশ এবং সেখান থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

কিছুটা অদূরদর্শিতার সঙ্গে আর্জেন্টিনা দাবি করে, ১৮১৬ সালেই তারা একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল এবং তখনই স্পেনের কাছ থেকে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। ফলে তাদের ভূখণ্ডগত ঐক্য সম্পন্ন হয়।

তারা আরও দাবি করে, যুক্তরাজ্য যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশ থেকে তাদের ভূখণ্ড দখল করেছিল।

ফলে আর্জেন্টিনা স্বীকার করে, স্বাধীনতার সময়ই তারা উতি পসিদেতিস সীমানার মধ্যে স্পেন থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও উপনিবেশমুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল।

এই পরিস্থিতিতে, ১৮৩৩ সালে যুক্তরাজ্য যখন পুনরায় ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, তখন আর্জেন্টিনার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে এই অধিকার লন্ডনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা যায় না।

তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের যুক্তি না থাকলেও আর্জেন্টিনা কেবল শক্তি প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতেই আইনগতভাবে দ্বীপগুলো দাবি করতে পারে।

তবে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ গৃহীত হওয়ার পর থেকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখল করা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর এর আগে বিশ্বজুড়ে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে যে ভূখণ্ড দখল করা হয়েছিল, তা উল্টে দেওয়া কার্যত অসম্ভব। এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো উপনিবেশিক আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি।

যেকোনো পরিস্থিতিতেই যুক্তরাজ্য দাবি করতে পারে, তারা অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল করেনি। বরং তারা এমন একটি ভূখণ্ডে পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ওপর তাদের বৈধ মালিকানা ছিল।

চ্যাথাম হাউসের দাবি, বাস্তবে ব্রিটেন শক্তি প্রয়োগ করেনি। ১৮৩১ সালে আর্জেন্টাইন প্রশাসনের প্রচেষ্টা থামিয়ে দেয় মার্কিন রণতরি ইউএসএস লেক্সিংটন। দুই বছর পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যখন পুনরায় প্রশাসন চালু করতে দ্বীপগুলোতে ফিরে আসে, তখন কোনো প্রতিরোধ হয়নি এবং কোনো গুলিও ছোড়া হয়নি।

আর্জেন্টাইন বসতি স্থাপনকারীদের ব্যাপকভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল—এমন দাবিও সঠিক নয়। অধিকাংশ মানুষই প্রায় ২০০ বছর ধরে যুক্তরাজ্যের অধীনে বসবাস করে আসছে। শুধু ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা কিছুদিন দ্বীপগুলো সামরিকভাবে দখল করে রেখেছিল। ওই সংক্ষিপ্ত সময়কালটিকে ব্যতিক্রম হিসবেই ধরা হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আর্জেন্টিনা কখনোই বলেনি যে, যুক্তরাজ্য দ্বীপগুলো হস্তান্তর না করা পর্যন্ত আর্জেন্টিনার জনগণ তাদের উপনিবেশিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পন্ন করতে পারেনি। বরং তারা আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি এড়িয়ে চলেছে। কারণ এটি আর্জেন্টিনার সমগ্র জনগণের বদলে দ্বীপগুলোর প্রকৃত বাসিন্দাদের ওপর প্রযোজ্য হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের দখলকে আত্মনিয়ন্ত্রণ আইনের বাইরে একটি সাম্রাজ্যবাদী ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করছে আর্জেন্টিনা। তবে এটি একটি আবেগপ্রবণ যুক্তি। জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও এটি প্রকৃত আইনি যুক্তি নয়।

ব্রিটেন যখন প্রথম দ্বীপগুলো দখল করে, তখন সেখানে কোনো আদিবাসী বা মূল জনগোষ্ঠী ছিল না। তাই তাদের কোনো নতুন উপনিবেশ গড়ে তুলতে হয়নি। আর আর্জেন্টিনার নিজস্ব দাবিও শেষ পর্যন্ত স্পেন একই সময়ে ও একই পদ্ধতিতে দ্বীপগুলো অর্জন করেছিল—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে।

জাতিসংঘ ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে একটি স্ব-শাসনবিহীন অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে। এটি সাধারণত সেই উপনিবেশিক ভূখণ্ডগুলোর জন্য ব্যবহৃত হয়, যেগুলো এখনো আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারী। তবে আর্জেন্টিনা জোর দিয়ে বলে, এটি সার্বভৌমত্বের বিরোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য দ্বীপগুলোর জনগণের ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্বীপগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করা এই অধিকারের মৌলিক লঙ্ঘন হবে। ২০০৮ সালের সংবিধানের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য দ্বীপগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়েছে। এর মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। ২০১৩ সালের এক গণভোটে অংশগ্রহণকারী ৯৯ শতাংশের বেশি মানুষ ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে মত দিয়েছে।

আর্জেন্টিনা এই যুক্তির জবাবে বলে, দ্বীপগুলোর জনগণ কৃত্রিমভাবে বসতি স্থাপন করেছে। তবে এই বসতি আর্জেন্টিনার ভূখণ্ডগত দাবিকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। আবার যুক্তরাজ্য দেখাতে পারে, সেখানে থাকা অর্ধেকেরও বেশি মানুষের শেকড় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই দ্বীপে রয়েছে।

তাছাড়া গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভূখণ্ডগত দাবির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অবস্থানই শক্তিশালী।

এক ধরনের সমঝোতার সূত্র হিসেবে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ধারাবাহিকভাবে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানাচ্ছে।

যদিও এটি সার্বভৌমত্বের বিরোধকে স্বীকার করে, যা কিছুটা আর্জেন্টিনার পক্ষেই যায়। তারপরও দ্বীপগুলোর জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব দেয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments