Wednesday, May 6, 2026
Homeআন্তর্জাতিকআটলান্টিকে প্রমোদতরীতে ৩ মৃত্যু: হান্তাভাইরাস কী, কতটা প্রাণঘাতী?

আটলান্টিকে প্রমোদতরীতে ৩ মৃত্যু: হান্তাভাইরাস কী, কতটা প্রাণঘাতী?

আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের মাঝে আটলান্টিক মহাসাগরে চলাচলকারী একটি প্রমোদতরীতে হান্তাভাইরাসের সম্ভাব্য সংক্রমণে তিন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার অন্তত একটি ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকির মাত্রা এখনো বেশ কম বলে আশ্বস্ত করেছে সংস্থাটি।

এই ভাইরাস সাধারণত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ালেও সম্ভাব্য সংক্রমণ একটি বড় প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে—ভাইরাসটি কি এখন মানুষের থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে?

ফ্রান্সের ‘ন্যাশনাল রেফারেন্স সেন্টার ফর হান্তাভাইরাস’-এর প্রধান ভার্জিনি সোভাজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ভাইরাসের নির্দিষ্ট ধরনটি (স্ট্রেইন) শনাক্ত করা গেলে ওই জাহাজে আসলে কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।

হান্তাভাইরাস কতটা সাধারণ বা এর বিস্তার কেমন?

সারা বিশ্বেই এই ভাইরাসের অস্তিত্ব রয়েছে এবং বছরজুড়েই এর সংক্রমণ দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ— চীন, রাশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

আমেরিকা মহাদেশ, ফিনল্যান্ড ও ফ্রান্সেও প্রতি বছর কয়েকশ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন।

হান্তাভাইরাসের কেবল নির্দিষ্ট কিছু ধরনই মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে পারে, যা মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে।

এই ভাইরাস কতটা বিপজ্জনক?

হান্তাভাইরাসকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। একটি হলো ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ড’ (ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা) এবং অন্যটি ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ (উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা) ভাইরাস।

ওল্ড ওয়ার্ল্ড ভাইরাসের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ১৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলোতে এই ভাইরাসে মৃত্যুর ঘটনা খুবই বিরল; মূলত আগে থেকে অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই এতে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

সংক্রমণের অনেক ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ থাকে না, আবার কখনো শরীর ব্যথা, পেট খারাপ কিংবা সামান্য কাশির মতো লক্ষণ দেখা দেয়। তবে কিছু বিরল ক্ষেত্রে কিডনির জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা থেকে সাময়িকভাবে কিডনি বিকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে (যদিও তা নিরাময়যোগ্য)।

অন্যদিকে, নিউ ওয়ার্ল্ড ভাইরাসের মারণক্ষমতা অনেক বেশি, যা ৪০ শতাংশও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই ধরনের সংক্রমণ দ্রুত ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র শ্বাসকষ্ট তৈরি করে, এমনকি অনেক সময় হৃদরোগজনিত সমস্যাও দেখা দেয়।

এর চিকিৎসা কী?

চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।

হান্তাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা প্রতিষেধক নেই; তাই চিকিৎসকরা মূলত উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই রোগীর চিকিৎসা করে থাকেন।

সংক্রমণ যদি ফুসফুসে মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তবে রোগীকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে অক্সিজেন থেরাপি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

যারা বনজ সম্পদ বা কৃষিকাজের মতো নির্দিষ্ট কিছু পেশার সঙ্গে যুক্ত, তাদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

যেকোনো সাধারণ সংক্রমণের মতো এক্ষেত্রেও বয়স্ক ব্যক্তি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ এবং যারা আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

এটি কি ছোঁয়াচে?

প্রমোদতরীতে যে ভাইরাস ছড়িয়েছে, সেটি ‘অ্যান্ডিস’ ভাইরাসের সংক্রমণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হান্তাভাইরাসের যতগুলো ধরন আছে, তার মধ্যে কেবল এই অ্যান্ডিস ভাইরাসই মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তবে এর জন্য দীর্ঘ সময় নিবিড় সংস্পর্শের প্রয়োজন হয়, যেমনটি সচরাচর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দেখা যায়।

মানুষ সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালা, মল বা প্রস্রাব মিশ্রিত বাতাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করলে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। এ ছাড়া সরাসরি মলের সংস্পর্শে এলে কিংবা প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।

ওই প্রমোদতরীর (ক্রুজ শিপ) ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হয় ভাইরাসটি একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে ছড়িয়েছে, অথবা আক্রান্ত ব্যক্তিরা জাহাজে ওঠার আগেই অন্য কোথাও থেকে (যেমন তারা যদি আগে একসঙ্গে কোথাও ভ্রমণে গিয়ে থাকেন) সংক্রমিত হয়েছিলেন।

সিকোয়েন্সিং বা জিনগত বিশ্লেষণ থেকে কী জানা যেতে পারে?

আক্রান্ত যাত্রীর শরীর থেকে ভাইরাসের নমুনা নিয়ে সেটির জেনেটিক সিকোয়েন্সিং বা জিনগত বিন্যাস বিশ্লেষণ করা হবে। এটি অনেকটা ভাইরাসের ডিএনএ টেস্ট বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার মতো, যার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে হান্তাভাইরাসের শত শত ধরনের (স্ট্রেইন) মধ্যে ঠিক কোনটি ওই জাহাজে ছড়িয়েছে।

যেহেতু জাহাজটি দক্ষিণ আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করেছিল এবং ওই অঞ্চলে ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ প্রাকৃতিকভাবেই বিদ্যমান, তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা এটি অ্যান্ডিস ভাইরাস হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

তবে পরীক্ষায় যদি দেখা যায় যে এটি অ্যান্ডিস ভাইরাস নয়, বরং উত্তর আমেরিকায় পাওয়া যায় এমন ‘সিন নোম্ব্রে’ ভাইরাসের মতো অন্য কিছু—তাহলে প্রমাণিত হবে যে সংক্রমণটি দক্ষিণ আমেরিকা বা আর্জেন্টিনা থেকে ঘটেনি।

হান্তাভাইরাসের অনেক ধরন থাকলেও এর মধ্যে ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ই মানুষের দেহ থেকে অন্য মানুষের দেহে সরাসরি ছড়াতে পারে। 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments