Wednesday, May 6, 2026
Homeআন্তর্জাতিকইরান যুদ্ধ যেভাবে চীনের জন্য ‘শাপে-বর’ হলো

ইরান যুদ্ধ যেভাবে চীনের জন্য ‘শাপে-বর’ হলো

ইরান যুদ্ধ অনেক নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা ইরান থেকে হাজারো মাইল দূরে থাকা দেশগুলোও এই যুদ্ধের উত্তাপ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে।

জেনেভায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার পটভূমিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আচমকা ইরানে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধের শুরুতেই জ্বালানি আমদানি-রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এই ঘটনার জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনের জন্য ‘শাপে-বর’ হয়ে দেখা দিয়েছে।

তেল-গ্যাসের জন্য বুভুক্ষু হয়ে পড়া দেশগুলো বুঝতে পেরেছে, স্বল্প মেয়াদে না হলেও দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানির বিকল্প উৎসের খোঁজ করতে হবে।

সে পথ ধরেই এসেছে চীনের নাম—যে দেশটি ‘টেকসই জ্বালানি’ বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উদ্ভাবন ও ব্যবহারে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় নিজেদেরকে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস আমদানি-রপ্তানির ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়। মাঝে এই নৌপথ খুলে দেওয়ার ঘোষণা এলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি অবরোধে এই পথে জাহাজ চলাচল শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। 

অচলাবস্থার নিরসনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ এলেও চূড়ান্ত সমাধান মিলছে না।

এমন বাস্তবতায়, বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যখন জ্বালানি সংকটে জর্জরিত, তখন চীনে ঘটেছে নীরব বিপ্লব।

গত মার্চে সৌর (সোলার) প্রযুক্তি, সৌর ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানির দিক দিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে বেইজিং। জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এম্বার এই তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ‘তেল সরবরাহে নজিরবিহীন সংকটে পড়ে বিভিন্ন দেশ পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।’

এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয় করতে কৃচ্ছ্রসাধনে মনোযোগ দিয়েছে। কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণসহ কয়েক ধরনের উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

ফলে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছে দেশগুলো। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারে চীন।

ইলেকট্রিক পরিবহন, বায়ু-চালিত টারবাইন ও সোলার প্যানেল উৎপাদনের দিক দিয়ে প্রথম অবস্থানে চীন।

গত ২৩ এপ্রিল এম্বারের প্রতিবেদনে জানানো হয়, চীন শুধু মার্চেই ৬৮ গিগাওয়াট সোলার প্রযুক্তি রপ্তানি করেছে। এর আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডের তুলনায় এটি ৫০ শতাংশ বেশি।

অপরদিকে, চীনের কাছ থেকে সোলার প্রযুক্তি আমদানিও অভাবনীয় হারে বাড়িয়েছে অনেক দেশ। চীনের এই প্রযুক্তি আমদানিতে নতুন রেকর্ড গড়েছে ৫০টি দেশ।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো।

এম্বারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইউয়ান গ্রাহাম বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা ও হঠাৎ করে সরবরাহ বন্ধের “বিস্ময়” সৌর প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা বাড়াতে কাজ করছে।’

‘ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে সৌরশক্তি। বর্তমান সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়ায় বিকল্প জ্বালানি খাতে উন্নয়ন আরও গতিশীল হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।

গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছর চীন সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির রপ্তানি ৭০ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। চীনের শুল্ক বিভাগ এই তথ্য জানিয়েছে।

এই তিন খাতকে চীনে ‘নব্য তিন’ বলা হচ্ছে। পোশাক, ঘরে ব্যবহারযোগ্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ও আসবাবপত্রের বদলে এই ‘নব্য তিন’ চীনের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করছে।

গত মার্চে ব্যাটারি রপ্তানি থেকে চীন ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বাজারে সবচেয়ে ভালো করছে মহাপ্রাচীরের দেশটি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সার্বিকভাবে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্বনেতাদের উদ্বেগে ফেলেছে। অনেক দেশই এখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।

এতদিন পর্যন্ত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ) গিয়ে অনেক দেশের প্রতিনিধিরাই ‘কার্বন নিঃসরণ’ কমানোর অঙ্গীকার করে এসেছেন। যদিও তাদের বেশিরভাগই এখনো কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে বড় খলনায়ক, তথা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তবে সে পরিস্থিতিও বদলাতে যাচ্ছে।

অনেকে বলছেন, ইরান সংকট আখেরে বিশ্ববাসীর উপকার করেছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই অপেক্ষাকৃত ‘দামি’, টেকসই জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে ধনী-গরিব দেশগুলো।

‘ইরান যুদ্ধ’ আপাতত বন্ধ থাকলেও সহসাই মিটবে না আঞ্চলিক গোলযোগ—এমনটাই ভাবছে তেল-গ্যাস নির্ভর দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, উভয়ই পারস্য উপসাগরে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ আটক করেছে।

‘বন্ধু’ ও আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত দেশগুলোও এ ক্ষেত্রে তেমন উপকারে আসেনি।

সব মিলিয়ে, এই নৌপথ দিয়ে আসা জ্বালানির ওপর আর ভরসা রাখতে পারছে না দেশগুলো।

ভবিষ্যতেও যাতে আকস্মিক সরবরাহ সংকটে বিপর্যয় দেখা না দেয়, এখন সেটার জন্য কাজ করছে দেশগুলো। তাদের চিন্তাধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।

আঞ্চলিক বাণিজ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখছে দেশগুলো। বিশ্লেষকদের মত, টেকসই জ্বালানি ব্যবহারে স্বনির্ভরতা অর্জনকেই সঠিক পথ হিসেবে দেখছে দেশগুলো।

গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী এডোয়ার্ড ‘এড’ মিলিব্যান্ড গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো আমরা জীবাশ্ম জ্বালানির তীব্র সংকটের মুখে। এটা আমাদের দেশের জন্য স্পষ্ট বার্তা ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সময় চলে এসেছে। টেকসই জ্বালানির যুগ শুরু হতে হবে।’

চলমান সংঘাতে সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে পাকিস্তান। কয়েক বছর আগে থেকে নাটকীয়ভাবে চীনের কাছ থেকে সোলার প্যানেল আমদানি বাড়াতে শুরু করে ইসলামাবাদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যেন আগে থেকেই এই তেল সংকটের ‘পূর্বাভাস’ পেয়েছিলো পাকিস্তানের মানুষ।

সোলার প্যানেল স্থাপনে অনেক অর্থ খরচ হলেও একবার এগুলো কাজ শুরু করলে তা প্রতি বছর মূল্যবান জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ লাখো ডলারের খরচ সাশ্রয় করে। পাকিস্তানও এই সুবিধা নিচ্ছে।

দেরিতে হলেও এশিয়ার অন্যান্য দেশ বুঝতে পারছে যে তাদেরকেও টেকসই জ্বালানিতে যেতে হবে।

বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে চীনের টেকসই জ্বালানি খাত ফুলেফেঁপে উঠেছে। এই খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করে এখন বিদেশেও রপ্তানি করছে বেইজিং।

অন্যান্য অনেক দেশ এখনো অটোমোবাইল, তৈরি পোশাক, ওষুধের মতো প্রথাগত পণ্য বাণিজ্যের ওপর নির্ভর করলেও চীন টেকসই জ্বালানিকে ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে দেখছে।

কোনো ধরনের বৈশ্বিক তেল সংকট বা এর নেতিবাচক প্রভাব চীনকে কখনোই স্পর্শ করে না। পাশাপাশি, টেকসই জ্বালানিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বলয় আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে মত দেন বিশ্লেষকরা।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের জ্বালানি শিক্ষা অনুষদের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো জিওং ওন কিম সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে বলেন, ‘চীনকে এতদিন কম খরচের সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এখন অনেক দেশই জ্বালানি উৎসের রূপান্তর প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদী অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।

তবে শুধু সোলার প্যানেলেই নয়। বৈদ্যুতিক গাড়িতেও চীনের সাফল্য ঈর্ষণীয়।

এম্বার অ্যানালিস্ট-এর হিসাব মতে, গত বছর বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ১৭ লাখ ব্যারেল তেল কম ব্যবহার হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির অর্ডার ও বিক্রি বেড়েছে বলে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।

গত মার্চে চীনের বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ির রপ্তানি আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। চীনের যাত্রীবাহী গাড়ি মালিকদের সংগঠন জানিয়েছে, ২০২৫ এর মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে ১৪০ শতাংশ বেড়েছে রপ্তানি।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা লরি মিলিভিরতা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতই বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে দেশগুলোকে উদ্বুদ্ধ করেছে।’

‘একদিকে সৌরশক্তি ও ব্যাটারির দাম কমছে আর অপরদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও দুর্মূল্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর হিসাব অনেক সহজ করে দিয়েছে। খুব একটা মাথা না ঘামিয়েও তারা এখন টেকসই জ্বালানিতে ঝুঁকছে,’ বলে মনে করেন তিনি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments