Friday, July 24, 2026
Homeপাঁচ সপ্তাহের উন্মাদনা এবং একটি শেষ বাঁশি

পাঁচ সপ্তাহের উন্মাদনা এবং একটি শেষ বাঁশি

টানা পাঁচটি সপ্তাহ বাংলাদেশের ঘড়ির কাঁটা যেন চলেছে একেবারেই ভিন্ন নিয়মে। মধ্যরাত হয়ে উঠেছিল উৎসবের মূল প্রহর। অ্যালার্ম ঘড়িগুলো সেট করা হতো কাজের বা স্কুলের তাগিদে নয়, বরং কিক-অফের সময়ের সঙ্গে মিল রেখে। ঘুম হয়ে দাঁড়িয়েছিল একপ্রকার ঐচ্ছিক ব্যাপার; আর সকালের প্রথম আড্ডায় যানজট বা রাজনীতির বদলে জায়গা করে নিয়েছিল অফসাইডের সিদ্ধান্ত, ট্যাকটিক্স কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের দুর্দান্ত মুহূর্তের গল্প। আগের রাতের ম্যাচের রেশ ধরে অফিসপাড়ায় চলত তুমুল তর্ক, আর পাড়ায় পাড়ায় বড় পর্দার সামনে জড়ো হতো গোটা মহল্লা।

অতঃপর রবিবার রাতে বেজে উঠল সেই শেষ বাঁশি। হাজার মাইল দূরে উত্তর আমেরিকায় যে টুর্নামেন্টের শুরু হয়েছিল, সেখানেই তার সমাপ্তি ঘটল। তবে অদ্ভুতভাবে, আরও একটি বিশ্বকাপ যেন নীরবে শেষ হলো আমাদের এই বদ্বীপেও।

বাংলাদেশের মতো বিশ্বকাপকে এমন নিংড়ে উদ্‌যাপন বোধ হয় খুব কম দেশই করে। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে যাদের কখনো ওঠাই হয়নি, সেই দেশটাই কেমন করে যেন পুরো টুর্নামেন্টকে একান্তই নিজের করে নেয়। প্রতি চার বছর অন্তর আমরা এমন কিছু রং ধার করি যা আদতে আমাদের নয়। যে দেশে হয়তো কখনো আমাদের পা পড়বে না, তাদের দেওয়া গোলে আমরা উল্লাসে ফেটে পড়ি, আবার তাদের হারেই আমাদের হৃদয় ভাঙে; অথচ কাগজে-কলমে এই কষ্টটুকু পাওয়ার কোনো অধিকারই আমাদের নেই।

তবুও একটি অবিস্মরণীয় মাসের জন্য এই স্বপ্নগুলো আমাদেরই হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ এমন এক দেশে পরিণত হয়, যা রঙের দিক থেকে বিভক্ত হলেও ফুটবলের আবেগে এক সুতোয় গাঁথা।

সারা দেশের প্রতিটি ছাদ যেন পরিণত হয়েছিল ফুটবল-ভক্তির ক্যানভাসে। ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়েছে আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা; পাশাপাশি স্পেন, ইংল্যান্ড আর পর্তুগালের ভক্তরাও পিছিয়ে ছিল না। পাড়ার দেয়ালগুলো লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো বা লামিন ইয়ামালদের ম্যুরালে সেজে উঠেছিল। এই খেলোয়াড়দের হয়তো অনেক বাংলাদেশি জীবনেও স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাবে না, অথচ মনে হয় যেন তাদের সঙ্গেই আমাদের বেড়ে ওঠা।

বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছিল গোটা দেশের এক সর্বজনীন ভাষা। প্রতিদিন রাতের কয়েকটা মহামূল্যবান ঘণ্টার জন্য খবরের কাগজের চিরচেনা শিরোনামগুলো যেন ছুটি নিয়েছিল। তার বদলে আড্ডায় জায়গা করে নিয়েছিল দলগুলোর ফরমেশন, রেফারির সিদ্ধান্ত, আর লিওনেল মেসির জাদুকরি বাঁ পায়ে শেষ কোনো চমক বাকি আছে কি না—সেই জল্পনা।

যে আড্ডাগুলোতে অন্য সময় কালবৈশাখী, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা দৈনন্দিন জীবনের হাজারো চাপ নিয়ে কথা হতো, সেগুলো অবলীলায় বাঁক নিত ফুটবলের দিকে। টুর্নামেন্ট যে আমাদের রূঢ় বাস্তবতাগুলো মুছে দিয়েছিল তা নয়, তবে কিছুদিনের জন্য সেগুলোকে অন্তত পেছনের সারিতে ঠেলে দিতে পেরেছিল।

ম্যাচের রাতগুলোতে খোদ ঢাকা শহরটাকেই বড্ড অচেনা মনে হতো। গোল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্টের ব্লকগুলোর মাঝ দিয়ে প্রতিধ্বনিত হতো সমবেত উল্লাস। ক্যাফে বা পাবলিক স্ক্রিনিংয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষগুলোও এক কাতারে দাঁড়িয়ে ভিএআর-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক করত, আবার শেষে এমনভাবে বিদায় নিত যেন তাদের পরিচয় বহু বছরের।

তবে পুরো টুর্নামেন্টের নির্যাসটুকু হয়তো ধরা পড়েছিল ছোট্ট একটি কথোপকথনে।

রবিবার মেট্রোতে দুই স্কুলছাত্র কথা বলছিল। পরদিন সকালে তাদের কঠিন এক পরীক্ষা, তবু রাত জাগাটা উচিত হবে কি না, তা নিয়ে চলছিল তর্ক। একজন তার মহামূল্যবান ঘুম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ভুগছিল। অন্যজন শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল, ‘এটা মেসির শেষ ম্যাচ। তাকে আর কখনো এভাবে দেখতে পাবি না। এই ইতিহাসের অংশ তোকে হতেই হবে।’

এই সহজ কথাটিই যেন বুঝিয়ে দিল, যা কোনো টেলিভিশন রেটিং বা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দিয়ে মাপা সম্ভব নয়।

সোমবার থেকে ধীরে ধীরে নামিয়ে ফেলা হবে উড়ন্ত পতাকাগুলো। মাঝরাতের অ্যালার্মগুলো আর বাজবে না। চায়ের দোকানগুলো একটু আগেই ঝাঁপ ফেলবে, আর আড্ডাগুলো আবার ফিরে যাবে কাজ, পরীক্ষা বা সেই পুরোনো দৈনন্দিন রুটিনের কাছে—যেগুলো কিছুদিন সযতনে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। ধার করা এই স্বপ্নগুলো আবার সযত্নে গুছিয়ে তুলে রাখা হবে, ঠিক আরেকটি বিশ্বকাপ না আসা পর্যন্ত।

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments