চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে কর্মরত সদস্যদের মধ্যে অস্থিরতা ও সংকট তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ছোটখাটো ও অধর্তব্য বিষয় নিয়ে শোকজ (কারণ দর্শানোর) নোটিশ দিচ্ছেন উপকমিশনার (ডিসি) বদিউজ্জামান।
এতে বিশেষায়িত এ ইউনিটে কাজের মানের দ্রুত অবনতি ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
অনেক সদস্য ইউনিট থেকে সিএমপির অন্য ইউনিটে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানা গেছে।
ডিসি বদিউজ্জামানের বিরুদ্ধে অধস্তন পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ব্যক্তিগত কাজে খাটানোর অভিযোগও উঠেছে। তার গাড়ি চালাতে চান না কেউ।
সিএমপির যানবাহন (এমটি) শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারিতে ইউনিটটির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ জন গাড়িচালক পরিবর্তন করেছেন বদিউজ্জামান।
সিএমপি সূত্রে জানা গেছে, ৮৭ জন জনবল নিয়ে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের অধীনে সাইবার ইউনিট, ল্যাব, সোয়াট, বোম ডিসপোজাল ইউনিট, ইন্টেলিজেন্স এবং ডগ স্কোয়াড কাজ করে আসছে।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বরে তাকে ডিসি হিসেবে পদায়ন করেন সিএমপির সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজ।
এ ইউনিটে কর্মরত বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডিসি বদিউজ্জামান সহকর্মীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন। সামান্য বিষয়ে শোকজ নোটিশ দেওয়া, অশোভন ভাষা ব্যবহার এবং অপমানজনক আচরণ করেন তিনি। এতে মানসিকভাবে অস্থিরতায় ভুগছেন অধিকাংশ সদস্য।
সিএমপি কাউন্টার টেররিজম ইউনিট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে গত ছয় মাসে প্রায় ৬০-৭০টি শোকজ চিঠি ইস্যু করেছেন ডিসি বদিউজ্জামান।
একইসঙ্গে, ইউনিটের প্রশিক্ষিত সদস্যদের সঙ্গে গুরুত্বপুর্ণ মামলা ও ঘটনা তদন্তে তার সঙ্গে অন্যদের কাজে যোগাযোগ ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে কর্মকর্তাদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ইউনিটের অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেইলি স্টারকে বলেন, রিকুইজিশন অর্ডার ছাড়াই কিংবা ডকুমেন্টস ছাড়াই ডিসি নগরীর সংবেদনশীল এলাকায় পুলিশ সদস্যদের অস্ত্রসহ অভিযানে যেতে বাধ্য করেন।
‘ইউনিটে কর্মরত পরিদর্শক থেকে শুরু করে এসআই, এএসআই সবাইকে তিনি ছোটখাটো বিষয়ে শোকজ করছেন। অন্যায় ও অযৌক্তিক নির্দেশনা না মানলে বদলির হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা, ভীতি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে,’ বলেন তারা।
ডিসির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করায় এক এসআই ও এক পরিদর্শকসহ কয়েকজনকে ইতোমধ্যে বদলি করা হয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
বদলিদের মধ্যে একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ডিসির পদায়নের পর তার কিছু সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করার কারণে আমাকে বদলি করে দেওয়া হয়।’
কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতার সময় অফিসে যেতে না পারা, কয়েক মিনিট দেরি করে যাওয়া, চুল বড় রাখা, সিসিটিভি কার্যকর না থাকা, জিডির তালিকা না রাখা, ডিউটি অফিসারকে বলে কিছু সময়ের জন্য বাইরে যাওয়াসহ নানা ইস্যুতে শোকজ নোটিশ দিচ্ছেন ডিসি বদিউজ্জামান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সিসিটিভি ঠিক করার দায়িত্ব সাপ্লাই বিভাগের। কিন্তু তিনি আমাদের অফিসারকে শোকজ করেন। জিডির তালিকার জন্য আলাদা লোক আছে। কিন্তু তিনি ইউনিটের কর্মকর্তাদের শোকজ করেন। অতর্কিত রোল কল করার সময় ২-৩ মিনিট দেরি হলেও তিনি কারণ দর্শানো নোটিশ দিচ্ছেন।’
‘এখানে কাজের চেয়ে চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং অযাচিত চাপ সামলানোই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে,’ বলেন ওই কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমটি শাখার এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ডিসি বদিউজ্জামান নানা কারণে কিছু দিন পরপর ড্রাইভার বদল করেন। এটি নিয়ে সার্বিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।’
‘গাড়ি একটু জোরে চালানো কিংবা ধীরে চালানোসহ সামান্য কারণে তিরস্কার করেন তিনি। তাই অনেকে এখন তার গাড়ি চালাতে চান না,’ বলেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে ডিসি বদিউজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শোকজ নোটিশের বিষয়ে আপনি কীভাবে জানেন? এগুলো অফিসিয়াল ইস্যু। ফোর্সের সঙ্গে আমার দূরত্ব থাকলে সেটা কমিশনার দেখবেন।’
‘আপনার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আপনি কমিশনারকে বলতে পারেন,’ বলেন তিনি।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে যোগাযোগ করা হলে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘বিষয়গুলো আমার জানা নেই। তবে অভিযোগ এলে এই বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে।’

