Wednesday, April 29, 2026
Homeসারাদেশজাপানে যে বিড়ালকে ঘিরে সচল হয় রেল স্টেশন, গড়ে ওঠে বাণিজ্যকেন্দ্র-তীর্থস্থান

জাপানে যে বিড়ালকে ঘিরে সচল হয় রেল স্টেশন, গড়ে ওঠে বাণিজ্যকেন্দ্র-তীর্থস্থান

জাপানের পাহাড়ঘেরা একটি ছোট্ট রেল স্টেশন, নাম ইদাকিসো। চারপাশে সবুজ বন, দূরে ছোট ছোট গ্রাম। কিছু সময় পরপরই সেখানে বেজে ওঠে ট্রেনের হুইসেল। সেখানে ঘুরে বেড়াত একটি ছোট্ট বিড়াল। যে বিড়ালটিকে সবাই ভালোবাসতো। অবাক ব্যাপার হলো, একদিন এই বিড়াল স্টেশনমাস্টার হয়ে ওই স্টেশনটিকে বাঁচিয়েছিল! কিন্তু কীভাবে?

গল্পের শুরুটা ১৯৯০ দশকের শেষের দিকে, তামা নামের একটি ছোট্ট বিড়ালকে দিয়ে। সে কিশি স্টেশনের কাছাকাছি থাকত। ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার লম্বা রেললাইনটি সেখানকার ছোট ছোট গ্রামকে ওয়াকায়ামা শহরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তামা প্রায়ই স্টেশনের আশেপাশে ঘুরে বেড়াত। আর যাত্রীরা তাকে খুব আদর করত। ধীরে ধীরে সে সবার প্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ আদর করে ‘কিশির স্টেশনমাস্টার’ নামে ডাকতে শুরু করে।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় ২০০০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে। হঠাৎ করে যাত্রী কমে যায়। এতে আর্থিক সমস্যা দেখা দিলো, ফলে গ্রামীণ রেললাইনটি বন্ধের ঝুঁকিতে পড়ে। অবশেষে ২০০৬ সালে ১৪টি স্টেশনের সব কর্মী ছাটাই করা হয়।

তবে রেললাইন বা সেই প্রিয় বিড়ালের গল্প এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। ২০০৬ সালে আগের মালিক কিশিগাওয়া রেললাইন বন্ধের ঘোষণা দেন। এরপর স্থানীয়রা ওয়াকায়ামা বৈদ্যুতিক রেলওয়ের প্রেসিডেন্ট মিতসুনোবু কোজিমাকে এটি আবার চালুর অনুরোধ জানান।

জানা যায়, কিশি ছিলেন স্টেশনের কাছের একটি দোকানের মালিক। তিনি তামার দেখাশোনা করতেন। ওই এলাকা ছাড়ার পর রেলওয়েকে তামার দায়িত্ব দিয়ে যান। ওদিকে রেলওয়ের প্রেসিডেন্ট কোজিমা ছিলেন কুকুরপ্রেমী। তবে তামাকে দেখে তার ভালো লেগে যায়।

দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই তামার জন্য বিশেষ স্টেশনমাস্টারের টুপি বানান কোজিমা। এরপর ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তামাকে কিশি স্টেশনের স্টেশনমাস্টার ঘোষণা করেন। সেবারই প্রথম জাপানে কোনো বিড়াল এমন পদ পেয়েছিল। স্টেশনমাস্টার হিসেবে তামার কাজ ছিল রেলওয়ের মুখপাত্র হওয়া, প্রচারণায় অংশ নেওয়া এবং যাত্রীদের স্বাগত জানানো।

কখনো সে টিকিট গেটের পাশে টেবিলের ওপর বসে থাকত, আবার কখনো নিজের ছোট্ট অফিসে বসে থাকত। পুরোনো টিকিট কাউন্টারকে তার অফিস বানানো হয়। সেখানে তার জন্য বিছানা ও লেটার বক্স রাখা ছিল।

তামা খুব দ্রুতই যাত্রী ও কর্মীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠে। স্টেশনে তার একটি ছবি আঁকা হয় এবং সুভেনির দোকানে তার অসংখ্য ছবি ঝুলিয়ে রাখা হয়। দর্শনার্থীরা সেখানে তামার ব্যাজ, কি-রিং এবং তামা নামের ক্যান্ডি পর্যন্ত কিনতে পারত। বেতনের পরিবর্তে তামা পেত সব ধরনের খাবার।

২০০৮ সালে তাকে পদোন্নতি দিয়ে সুপার স্টেশন ম্যানেজার করা হয়। এমনকি তাকে সম্মানসূচক নাইট উপাধিও দেওয়া হয়। এই উপলক্ষে তাকে একটি গাঢ় নীল পোশাক পরানো হয়। এরপর ছোট্ট সেই স্টেশনটি হাজার হাজার পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

এক গবেষণার বরাতে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ সালে তামার কারণে কিশিগাওয়া রেললাইনে প্রায় ৫৫ হাজার অতিরিক্ত যাত্রী ভ্রমণ করেন। ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তার কারণে ওই এলাকার অর্থনীতিতে প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ইয়েন যোগ হয়।

ওয়াকায়ামা ইলেকট্রিক রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের তুলনায় এই রেললাইনের বার্ষিক যাত্রীসংখ্যা প্রায় তিন লাখ বেড়ে যায়।

তামার জনপ্রিয়তাকে আরও কাজে লাগাতে ২০১০ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বিখ্যাত ডিজাইনার এজি মিতুওকাকে দিয়ে ট্রেনের ভেতর ও বাইরে নতুনভাবে সাজায়। এভাবেই তামাডেন নামে একটি বিশেষ ট্রেন চালু হয়। ট্রেনটির বাইরের অংশে তামার পায়ের ছাপ ও তার অনেকগুলো কার্টুন আঁকা হয়। আর সামনে ছোট ছোট গোঁফের মতো নকশা করা হয়। ভেতরে ছিল কাঠের মেঝে ও শিশুদের বইয়ের তাক। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, প্রতিটি স্টেশনে দরজা খোলার সময় স্পিকারে তামার মিউ মিউ ডাক শোনা যেত।

২০১৫ সালে ১৬ বছর বয়সে তামা মারা যায়। এর মধ্যে সে জাপানের জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান, ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় জায়গা করে নিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ তার শেষকৃত্যে হাজির হয়েছিল। তার স্মরণে মানুষ ফুলের তোড়া ও টুনা মাছের ক্যান রেখে যায়। পরে তাকে ‘চিরস্থায়ী ফেলো স্টেশনমাস্টার’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিশি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে তার জন্য একটি ছোট্ট মন্দির তৈরি করা হয়। জাপানের শিন্তো ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী তাকে ওয়াকায়ামা ইলেকট্রিক রেলওয়ে এক ধরনের দেবীর মর্যাদা দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে তার ১৮তম জন্মদিন উপলক্ষে গুগল বিশেষ ডুডল তৈরি করে। মৃত্যুর পরেও তার টুইটার অ্যাকাউন্টে লাখো অনুসারী আছে, এবং সেই সংখ্যা এখনো বাড়ছে।

তামার মৃত্যুর পর তারই শিষ্য আট বছর বয়সী নিতামাকে কিশি স্টেশনের স্টেশনমাস্টারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চার বছর বয়সী ইয়োনতামা পাঁচ স্টেশন দূরের ইদাকিসো স্টেশনে তার সহকারী হিসেবে কাজ করছে। তারা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করে। সপ্তাহে দুই দিন ছুটি থাকে, ইয়োনতামার ছুটি সোমবার ও শুক্রবার, আর নিতামার ছুটি বুধবার ও বৃহস্পতিবার।

২০০৯ সালে ডিজাইনার এজি মিতুওকা কিশি স্টেশনের জন্য একটি নতুন ভবন ডিজাইন করেন। এটি খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট একটি ঘর, যা দেখতে বিড়ালের মাথার মতো। ছাদের ওপর ছোট দুটি কান, প্রবেশপথটি মুখের মতো করে বানানো হয়। আর দুই পাশে থাকা জানালাগুলো হলো চোখের মতো, সন্ধ্যায় আলো জ্বাললে সেগুলো হলুদ রঙে জ্বলে ওঠে।

যখন আলো জ্বলে ওঠে, তখন স্টেশনটি যেন জীবন্ত বিড়াল হয়ে যায়। সেখানকার স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, বিড়াল অশুভ শক্তি ও দুর্ভাগ্য দূর করে। জাপানের এই স্টেশনটাও হয়তো তাই করে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments