Wednesday, April 29, 2026
Homeখেলাআফিফের হিমশিম খাওয়া যেন বাংলাদেশেরই দুর্দশার প্রতিফলন

আফিফের হিমশিম খাওয়া যেন বাংলাদেশেরই দুর্দশার প্রতিফলন

মিরপুরে গত শুক্রবার তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ড ও বাংলাদেশের শুরুটা ছিল প্রায় একই রকম, কিন্তু পরবর্তী সময়ে দুই দলের ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

এর মূলে ছিলেন বাংলাদেশের আফিফ হোসেন— যিনি তার ওপর অর্পিত ফিনিশারের দায়িত্ব পালনে আবারও ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের ডিন ফক্সক্রফট কন্ডিশন বুঝতে ও সেই অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে দারুণ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

টস জিতে ব্যাটিং করতে নামা নিউজিল্যান্ড ২৭.৫ ওভারে ১৩১ রানে যখন তাদের চতুর্থ উইকেট হারায়, তখন ক্রিজে আসেন ফক্সক্রফট। নিজের মাত্র দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নামা ২৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার তার অভিজ্ঞতার চেয়েও বেশি পরিপক্কতা দেখিয়েছেন। ২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে এবং গত বছর নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশ সফর করায় এখানকার কন্ডিশন সম্পর্কে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন।

ফক্সক্রফট ৫৮ বলে ৫৯ রানের এক মাপা ইনিংস খেলেন। বিচক্ষণতার সাথে স্ট্রাইক রোটেট করে ও পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে তিনি দলকে ৮ উইকেটে ২৪৭ রানের এক লড়াকু পুঁজিতে পৌঁছে দেন। এই লক্ষ্য বাংলাদেশের জন্য বরাবরই চ্যালেঞ্জিং ছিল, কারণ গত দুই বছরে ওয়ানডেতে আটবার রান তাড়ায় তারা মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে তারা।

বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটাও ছিল অনেকটা একই ধাঁচের। তারাও প্রায় একই সময়ে— ২৭.২ ওভারে ১৩২ রানে চতুর্থ উইকেট হারায়, যা আফিফের জন্য মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল। সেট ব্যাটার সাইফ হাসান ও লিটন দাসের দ্রুত বিদায়ের পরও স্বাগতিকরা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল, কারণ ক্রিজে ছিলেন তাওহিদ হৃদয় এবং অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ ব্যাটিংয়ে নামার অপেক্ষায় ছিলেন।

সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১৩৬ বলে ১১৬ রান— উইকেট ও কন্ডিশন বিবেচনায় যা বেশ সহজসাধ্য ছিল। তবে এখান থেকেই দুই দলের সমান্তরাল পথ বেঁকে দুই দিকে চলে যায়।

রানের গতি বজায় রাখার পরিবর্তে মিডল অর্ডার ব্যাটাররা চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন। আফিফ ও হৃদয় বাউন্ডারি মারতে রীতিমতো হাঁসফাঁস করছিলেন। তাদের ৫২ রানের জুটিতে বাউন্ডারি এসেছে মাত্র একটি। ডট বলের আধিক্যে প্রয়োজনীয় রান রেট ছয়ের ওপরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত খোলস থেকে মুক্তি পাওয়ার মরিয়া চেষ্টায় লং-অনে ক্যাচ দিয়ে ৪৯ বলে ২৭ রানের এক ধীরগতির ইনিংস খেলে ফেরেন আফিফ, যা বাংলাদেশের রান তাড়া করাকে বিপর্যস্ত করে তোলে।

ফক্সক্রফট ও আফিফ— উভয়ের সামনে ম্যাচের পরিস্থিতি একই রকম থাকলেও তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। ফক্সক্রফট স্বচ্ছ ধারণা ও উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন। অন্যদিকে, আফিফ পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা দলে তার ভূমিকা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে।

১৬ মাসের বিরতি কাটিয়ে গত মাসে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে দলে ডাক পাওয়া ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার ফেরার পর এখন পর্যন্ত নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। ওই সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে তিনি ব্যাটিং পাননি, দ্বিতীয় ম্যাচে করেন ১৪ এবং তৃতীয় ম্যাচে সাত নম্বরে নেমে ৫ রানে অপরাজিত ছিলেন।

তবে এই ব্যর্থতার জন্য কি কেবল আফিফই দায়ী?

সমস্যাটা মনে হচ্ছে আরও গভীরে। টিম ম্যানেজমেন্ট বারবারই তাকে ফিনিশার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে তার সব বড় সাফল্য এসেছে ব্যাটিং অর্ডারের ওপরের দিকে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) তিনি সেঞ্চুরি করেছেন চার নম্বরে ব্যাটিং করে— যে পজিশনে তিনি নিয়মিত বিপিএলসহ বিভিন্ন ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতেও খেলেন।

বিপরীতে, আফিফের ওয়ানডে ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলে। তার ৩৩টি ইনিংসের মধ্যে ২৭টিই এসেছে ছয় নম্বর বা তার নিচের পজিশনে। ওপরের সারির প্রথম পাঁচ পজিশনে তিনি ব্যাটিং করেছেন মাত্র ছয়বার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার ধারাবাহিকতাহীনতার পেছনে তার স্বভাবজাত পজিশন ও তাকে দেওয়া ভূমিকার এই অমিলই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্টের করা পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুব কমই সুফল বয়ে এনেছে। শেষ ম্যাচের ব্যর্থতা আবারও প্রমাণ করেছে যে, কোনো ক্রিকেটারকে তার জন্য অনুপযুক্ত ভূমিকায় জোর করে খেলানোর ঝুঁকি কতটা বেশি। যদি এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হয়, তবে আফিফের ক্যারিয়ার কেবল অনিশ্চয়তার দিকেই এগোবে এবং দলের ব্যাটিং সমস্যারও কোনো সমাধান হবে না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments