Wednesday, April 29, 2026
Homeসারাদেশউদ্ধার ৯ জনের ৬ জনই ‘মানব পাচারকারী’, নিখোঁজদের তালিকা নেই

উদ্ধার ৯ জনের ৬ জনই ‘মানব পাচারকারী’, নিখোঁজদের তালিকা নেই

আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় নয়জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয় বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে কোস্টগার্ড। বাকি তিনজন রোহিঙ্গা।

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে ডুবে যায় ট্রলারটি। জাতিসংঘসহ কয়েকটি সংস্থা জানিয়েছে, এ ঘটনায় অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

গত ৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমটি মেঘনা প্রাইড’ সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় নয়জনকে উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে একজন নারী। তারা পানির বোতল, কাঠের টুকরা ও বিভিন্ন ভাসমান বস্তু ধরে ছিলেন। পরে তাদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় ১১ এপ্রিল টেকনাফ থানায় মামলা করে কোস্টগার্ড।

মামলার এজাহারে বলা হয়, অভিযুক্ত ছয় বাংলাদেশি একটি মানব পাচার চক্রের সদস্য। তারা হলেন—কক্সবাজার সদরের মো. হামিদ ও মো. আকবর, টেকনাফের বাহারছড়ার মো. তৌফায়েল, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের সৈয়দ আলম, হ্নীলার মো. সোহান উদ্দিন ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের মহিউদ্দিন হৃদয়।

উদ্ধার হওয়া দুই রোহিঙ্গা চার অভিযুক্তের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন।

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা ও উদ্ধার হওয়া মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হামিদ ও সৈয়দ আলম ছিলেন মাঝি, মহিউদ্দিন হৃদয় ইঞ্জিন চালাতেন ও আকবর দালাল হিসেবে কাজ করতেন। অন্য দুইজনের ভূমিকা সম্পর্কে আমি জানি না।’

তিনি বলেন, ‘আকবর যাত্রীদের ওপর নির্যাতন চালাতেন। আমি এক গ্লাস পানি চাইলে, সে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দেয়। তিনি সবচেয়ে বেশি মানুষকে মারধর করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্প-৬ এর ব্লক সির মাহ নূর নামের এক দালাল আমাকে টেকনাফ বন্দরে কাজ দেওয়ার কথা বলে ট্রলারে তোলে। পরে আমার পরিবার তিন লাখ টাকা দেয়। ট্রলারডুবির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ওই দালাল পালিয়ে যায়।’

ক্যাম্প-১ এর বাসিন্দা ও উদ্ধার হওয়া এনাম উল্লাহ ইমরানও একই ধরনের বর্ণনা দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জীব কান্তি নাথ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কোস্টগার্ড মামলাটি করেছে। তদন্তে ছয়জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। আমরা রিমান্ড চাইব, এরপর বিস্তারিত বলা যাবে।’

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয়জনকে মামলার আসামি করা হয়েছে। তারা বর্তমানে কারাগারে। তদন্তে জানা গেছে, দালালদের মাধ্যমে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রী সংগ্রহ করে ট্রলারে তোলা হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘২৫০ জন নিখোঁজের বিষয়ে এখনো কোনো মামলা হয়নি।’

টেকনাফে মানব পাচারকারীদের কোনো নির্দিষ্ট তালিকা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট তালিকা নেই, তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মান্নান বলেন, ‘নিখোঁজদের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।’

প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজের কোনো তালিকা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনো কোনো নির্দিষ্ট তালিকা পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা প্রশাসনকে স্পষ্ট তথ্য দিচ্ছেন না। আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি ও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি।’    

রোহিঙ্গাদের মানব পাচারের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, বাস্তুচ্যুতি ও রাষ্ট্রহীনতা থেকে তৈরি হওয়া গভীর অনিশ্চয়তাই বড় কারণ। তাদের ফেরার কোনো নিশ্চয়তা নেই, নিজ দেশে সংঘাত চলছে, আর ক্যাম্পের জীবনও অনুকূল নয়। এসব মিলিয়ে হতাশা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, এই আশাহীনতা ও স্বপ্নহীনতা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় ঠেলে দেয়। তারা বিশ্বাস করে সমুদ্রের ওপারে ভালো জীবন আছে। তাই কাঠের নৌকায় করেও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বের হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা স্বজনদের সহায়তা নেয় বা স্থানীয় দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, ঠিক কতজন রোহিঙ্গা মানব পাচারের শিকার হয়েছেন, তা নির্ধারণ করা কঠিন।

‘যারা সফলভাবে চলে যায়, তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। সাধারণত ট্রলারডুবি, উদ্ধার অভিযান বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরই তথ্য সামনে আসে,’ বলেন তিনি।

 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments