Wednesday, April 29, 2026
Homeখেলাএক চুম্বন, এক নির্মম শূন্যতা

এক চুম্বন, এক নির্মম শূন্যতা

মাঠজুড়ে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা। যেন হাজার হাজার মানুষের কোলাহল একসাথে গিলে ফেলেছে কোনো অদৃশ্য শক্তি। আলো জ্বলা সেই বিশাল সবুজ মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। তার চোখে ক্লান্তি, মুখে অব্যক্ত চিন্তা, আর বুকের ভেতর ধুকপুক করছে এক দেশের স্বপ্ন। তার সামনে রাখা একটি বল, কিন্তু সেটি আর কেবল বল নয়, এটি ভাগ্যের গোলক, ইতিহাসের দরজা, অথবা এক অমোঘ বিচার।

মিশেল প্লাতিনি। নামটির মধ্যেই যেন এক যুগের গৌরব লুকিয়ে আছে। তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, ছিলেন এক সুরকার, যিনি পায়ের ছোঁয়ায় বলকে বানাতেন সিম্ফনি। কিন্তু সেই রাত, সেই ম্যাচ, সেই কয়েক সেকেন্ড, সবকিছু যেন তাকে নামিয়ে আনে নির্মম বাস্তবতায়।

গুয়াদালাহারার আকাশ থেকে তখন যেন আগুন ঝরছে। ২১ জুন, ১৯৮৬। মেক্সিকোর এস্তাদিও হালিস্কো স্টেডিয়াম সেদিন রূপ নিয়েছিল এক বিশাল রোমান কলোসিয়ামের। গ্যালারির এক প্রান্তে লাতিন সাম্বার হলুদ-সবুজ ঢেউ, তো অন্য প্রান্তে ফরাসি শিল্পের নীল রঙের মাতাল আবেশ। দিনটি ফরাসি অধিনায়ক প্লাতিনির জন্য ছিল অন্যরকম এক আবেগের। কারণ, সেদিন তার ৩১তম জন্মদিন। কিন্তু বিধাতা হয়তো অলক্ষ্যে হেসেছিলেন। তিনি হয়তো আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, এই জন্মদিনে উৎসবের বাঁশির চেয়ে বিষাদসিন্ধুর সুরই বেশি মানাবে।

ততক্ষণে ১২০ মিনিটের এক মহাকাব্যিক রণাঙ্গনের সাক্ষী হয়ে গেছে বিশ্ব। একপাশে জিকো, সক্রেটিস, কারেকা; অন্যপাশে প্লাতিনি, তিগানা, গিরেসে। ফুটবল মাঠের কবিরা সেদিন এক মোহময়, তীব্র ছন্দের লড়াইয়ে মেতেছিলেন। কারেকার গোলের পর প্লাতিনির সেই সমতাসূচক গোল, ম্যাচটি এমনিতেই ছড়িয়েছিল ধ্রুপদী সৌরভ।

কিন্তু ফুটবল তো কেবল সৌন্দর্যের পূজারি নয়, সে চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতারও উপাসক। তাই ভাগ্য নির্ধারণের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত হলো পেনাল্টি শুটআউটের। স্নায়ুর এই চরম কসাইখানায় যখন একে একে বড় নামগুলো ধসে পড়ছে, তখন ফরাসিদের সমস্ত স্বপ্নের ভার কাঁধে নিয়ে স্পট কিকের দিকে এগিয়ে গেলেন তাদের অবিসংবাদিত সম্রাট স্বয়ং।

মাঠের মধ্যবৃত্ত থেকে পেনাল্টি বক্স পর্যন্ত সেই হাঁটাপথটুকু সেদিন প্লাতিনির কাছে কত দীর্ঘ মনে হয়েছিল, কে জানে! ১২০ মিনিটের ক্লান্ত শরীরে, ঘামে ভেজা জার্সিতে তিনি যখন স্পটের সামনে দাঁড়ালেন, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি চোখ তখন তার ওপর স্থির। তিনি নিচু হলেন, পরম মমতায় দু’হাতে তুলে নিলেন বলটিকে।

চামড়ার গায়ে লেগে থাকা মেক্সিকোর ধুলো যেন তার হাতের ছোঁয়ায় পবিত্র হয়ে উঠল। চোখ দুটো আলতো করে বুজে এলো তার। এরপর সেই বিখ্যাত চুম্বন। এ কি কেবলই একটি বলকে চুমু খাওয়া? নাকি নিজের জন্মদিনে নিজেকেই দেওয়া এক আগাম উপহারের প্রতিশ্রুতি? নাকি এক ক্লান্ত যোদ্ধার শেষ অস্ত্রটিকে করা এক সনির্বন্ধ অনুরোধ?

রেফারির বাঁশি বাজলো। জাদুকর কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেন। পরিচিত সেই মায়াবী রান-আপ, নিখুঁত শারীরিক ভারসাম্য, আর তারপর বুটের সাথে বলের সেই চূড়ান্ত সংঘর্ষ। গ্যালারির পিনপতন নীরবতা ভেঙে তার ডান পা সজোরে আঘাত করল বলকে।

কিন্তু নিয়তি সেদিন সত্যিই বড় নির্মম ছিল। যে বলটিকে তিনি একটু আগেই প্রেমিকের মতো আদর করেছিলেন, সেই বলটিই তার সাথে করল জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতা। বলটি ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক কার্লোসকে ফাঁকি দিল ঠিকই, কিন্তু ফাঁকি দিতে পারল না ক্রসবারকে। অপ্রত্যাশিত উঁচুতে উঠে গিয়ে বলটি যেন মিলিয়ে যেতে চাইল মেক্সিকোর ধূসর আকাশে।

মুহূর্তের জন্য পুরো স্টেডিয়াম যেন দম নিতে ভুলে গেল। মাথা নিচু করে, হাত দুটো কোমরে রেখে স্পট কিকের ঠিক ওই জায়গাতেই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন ফরাসি কিংবদন্তি। তার কাঁধ দুটো সামান্য ঝুঁকে পড়েছে, চোখে অবিশ্বাস আর একবুক শূন্যতার হাহাকার। সারা বিশ্বের টেলিভিশন সেটে তখন কেবল একটি পরাস্ত, ক্লান্ত নায়কের প্রতিচ্ছবি।

পরবর্তীতে সতীর্থ লুইস ফার্নান্দেজের কল্যাণে ফ্রান্স সেই বৈতরণী পার হয়ে সেমিফাইনালে ঠিকই পৌঁছেছিল, কিন্তু প্লাতিনির ওই মিস করা পেনাল্টি আর তার আগের সেই চুম্বন অমর হয়ে রইল ইতিহাসের ক্যানভাসে।

সেই তপ্ত দিনে, প্লাতিনির ওই ব্যর্থতা বিশ্বকে এক অমোঘ সত্য জানিয়ে গিয়েছিল, ফুটবলের দেবতারাও কখনো কখনো বড্ড রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠেন, আর তাদের সেই নিখুঁত অসম্পূর্ণতাগুলোই জন্ম দেয় কালজয়ী সব ট্র্যাজেডির।

আর সেই চুম্বন?

সেটি আজও রয়ে গেছে একটি নীরব প্রশ্ন হয়ে, যার উত্তর হয়তো ফুটবল নিজেও জানে না।
 

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments