‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’—গুগলের এআই ওভারভিউ বলছে—এটি তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচিত স্লোগান। এটি সাধারণত নির্বাচনের সময় ভোটারদের উদ্দেশে বলা হয়। এর অর্থ—কারও সঙ্গে কোনো তর্ক বা উচ্চবাচ্য না করে, শান্তভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তৃণমূলের ‘জোড়াফুল’ বা ‘ঘাসফুল’ প্রতীকে ভোট দিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূলের এই স্লোগান বেশ কার্যকর ছিল। সেসময় তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল সেই সময়ের ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট সরকার। তাদের দলীয় ও নির্বাচনী প্রতীক ‘হাতুড়ি-কাস্তে’।
কারও কারও মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বহুল উচ্চারিত স্লোগানের ‘ধার’ কমেছে। কেউ আবার বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের তথা এবারের বিধানসভা নির্বাচনে এই স্লোগানটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ১৫ বছর ধরে রাজ্য-ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের ‘মাথা ব্যথা’র মূল কারণ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ও পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধীদল বিজেপি।
ভারতের রাজনীতিতে ক্রমশ ‘অপ্রতিরোধ্য’ হয়ে উঠা বিজেপির দলীয় ও নির্বাচনী প্রতীক ‘পদ্ম’।
তাই, কেউ যদি বলেন, ‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’ তাহলে তা ঠিক কোন ফুল বোঝাবে তা নিয়েই প্রশ্ন। এর জবাব রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের বিপক্ষেও যেতে পারে।
২০১১ সালে বামেদের ‘হাতুড়ি-কাস্তের’ বিপক্ষে ‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’ স্লোগান দেওয়ার সময় ফুল বলতে শুধুমাত্র তৃণমূলের ‘জোড়াফুল’ প্রতীককেই বোঝাতো।
এবারের নির্বাচনে জোড়াফুলের পাশাপাশি প্রতীক হিসেবে ‘পদ্ম’ থাকায় ভোটাররা যদি ‘চুপচাপ পদ্মে ছাপ’ মেরে দেন, তাহলে স্লোগানটি তৃণমূলের জন্যই বুমেরাং হবে।
গত ১ মে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জি ২৪ ঘণ্টার এক প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হয়—‘পদ্মে কত, ঘাসফুলে কত? গেরুয়া-সবুজ যুদ্ধে কে এগিয়ে?’
এতে বলা হয়, ‘পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষার ফল প্রকাশ্যে আসার পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ সমীক্ষাতেই বিজেপি এগিয়ে। তবে কোনো কোনো সমীক্ষায় তৃণমূলও এগিয়ে।’
প্রতিবেদন অনুসারে—নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বুথফেরত বা প্রাক-নির্বাচনী জনমত সমীক্ষা বাস্তবের সঙ্গে তেমন একটা মেলে না। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে না মেলার বহু উদাহরণ আছে। আবার মিলে যাওয়ার দৃষ্টান্ত যে নেই তা বলা যাবে না।
পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভায় মূলত ২ ফুলের দ্বন্দ্ব দেখা যাবে—এ নিয়ে কোনো দলের সন্দেহ নেই।
২০১১ সালে যে স্লোগান অর্থাৎ, ‘চুপচাপ ফুলে ছাপ’ বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল; ২০২৬ সালে সেই স্লোগান তৃণমূলকে সরানোর ‘হাতিয়ার’ হয় কিনা দেখার বিষয়।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন—এবার পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা ইতোমধ্যে রেকর্ড গড়েছেন ভোটকেন্দ্রে সমবেত হওয়ার ক্ষেত্রে। গত ২৩ এপ্রিল নির্বাচনের প্রথম দফায় ৯৩ শতাংশের বেশি মানুষ ভোট দেন।
এর ৬ দিন পর অর্থাৎ, ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ভোট পড়ে ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ।
গত ২৯ এপ্রিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এপিবি আনন্দ দেশটির নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়—পশ্চিমবঙ্গে ২ দফা মিলিয়ে ভোট পড়ার হার ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ‘রেকর্ড ব্রেকিং’ ভোট পড়েছে বলেও প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়।
তবে এত বেশি ভোট রাজ্যবাসী ‘আগ্রহ’ নিয়ে দিয়েছেন, নাকি আতঙ্কে দিয়েছেন তা নিয়ে ‘চুলচেরা’ বিশ্লেষণও চলছে সংবাদ ও সমাজমাধ্যমগুলোয়।
সব বিশ্লেষণের ভাষ্য একটাই—এই রেকর্ড সংখ্যক ভোট যদি ‘জোড়াফুল’ ও ‘পদ্মের’ কোনো একটিতে পড়ে তাহলে মলিন হয়ে পড়বে একটি।
কেননা, একসঙ্গে ২ ফুলের ‘হাসি’ বঙ্গবাসীর দেখার সুযোগ নেই।
পশ্চিমবঙ্গে যারা তৃণমূল ও বিজেপির প্রতি বিরক্ত বা জোড়াফুল বা পদ্মের প্রতি অনুরক্ত নন, তাদের জন্য বিকল্প কিছু আছে কি?—এমন প্রশ্ন জাগতে পারে অনেকের মনে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূল-বিজেপির বিকল্প খুঁজছেন।
এর প্রতিফলন দেখা গেল বামফ্রন্টের এক দেয়াল লেখনীতে: ‘দুই ফুলের উগ্র গন্ধে মাথা ব্যথা? বাম লাগান’।
আজ ২ মে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বর্তমান-এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘অন্তত একটা আসন কি হবে? প্রশ্ন বাম কর্মী-সমর্থকদের, রিপোর্ট দেখে কী বলছেন আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতারা?’
এতে বলা হয়—তৃণমূল-বিজেপি যখন সরকারে আসার লড়াই করছে, সেই সময় ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকা বামফ্রন্ট অংক কষছে খাতা খোলার। অর্থাৎ, বিধানসভায় বিনা আসনের বদনাম ঘোচানোর।
‘ভোট নিয়ে আলোচনার মধ্যে সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের প্রশ্ন একটাই, অন্তত একটা (আসন) কি হবে? কেউ হ্যাঁ বললেই, পরের প্রশ্ন, কোন আসনটা?’
প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়—ভোটের আগেই বর্ষীয়ান নেতা বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেছিলেন, ‘সিপিএম আর মহাশূন্যে থাকবে না।’ তবে তার এমন আশার বাণীতে সিপিএমের নিচু তলার কর্মী-সমর্থকদের মন খুব একটা ভিজছে না। কারণ, আশঙ্কা একটাই—বিজেপিতে চলে যাওয়া ভোট আবার সিপিএমে ফিরবে তো?
এক সিপিএম-কর্মীর কথা: মানুষের কাছে বিজেপির ভয়াবহতার কথা তুলে ধরছি। কিন্তু, এর প্রভাব ভোটবাক্সে পড়বে কিনা সেটাই দেখার।
পশ্চিমবঙ্গে এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হচ্ছে যে, রাজ্যে তৃণমূলবিরোধী বামের ভোট ‘রাম’ পাচ্ছে। অর্থাৎ বিজেপির বাক্সে ঢুকছে বামপন্থিদের ভোট।
২ ফুলের ‘কটু’ গন্ধ এড়াতে বামেদের ভোট হাতুড়ি-কাস্তেতেই ফেরাতে হবে, বলে মত বাম-ঘেঁষা বিশ্লেষকদের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে—তৃণমূলের বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গবাসী এবারও জোড়াফুলেই আস্থা রাখছেন। অন্যদিকে, বিজেপির প্রত্যাশা—অঙ্গ (বিহার) ও কলিঙ্গের (উড়িষ্যা) মতো ভোটাররা এবার বঙ্গ তথা পশ্চিমবঙ্গকে তাদের হাতে তুলে দেবেন।
শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য—এবার ‘বঙ্গ বিজয়ের’ জন্য বিজেপি ‘সর্বশক্তি’ নিয়োগ করেছে।
২০২৫ সালে বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে ২৪৩ আসনের মধ্যে ২০২ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আছে বিজেপি-জোট।
এর আগের বছর তথা ২০২৪ সালে উড়িষ্যার বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল আসন নিয়ে প্রথমবারের মতো এককভাবে সরকার গঠন করে বিজেপি।
এ ছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী আসাম ও বাংলা ভাষাভাষী ত্রিপুরায় বিজেপি-শাসন চলছে।
ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়—দেশটির পশ্চিম সীমান্তে রাজস্থান-গুজরাট থেকে শুরু করে পুব সীমান্তে মণিপুর-অরুণাচল গেরুয়ায় রঙিন। এর মাঝখানে ‘বাধা’ হিসেবে আছে এক চিলতে সবুজ।
গেরুয়া চাদরে বঙ্গের সেই সবুজকে ঢেকে দেওয়ার বাসনায় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তথা দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিরলস পরিশ্রম করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন—প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি-বঙ্গ ‘ডেইলি প্যাসেঞ্জারি’ করতে হয়েছে। আর অমিত শাহকে পশ্চিমবঙ্গে এক সপ্তাহ থাকতে হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য।
তৃণমূলের বক্তব্য: দিল্লির মোদি-শাহ ‘বঙ্গ দখল করতে মরিয়া’ হয়ে পড়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ এখন তাদের ‘প্রেসটিজ ইস্যু’। বিজেপির ভাষ্য: মানুষ আর তৃণমূলের ‘শাসন’ মানছে না।
অঙ্গ-কলিঙ্গের মতো বহুল প্রত্যাশিত বঙ্গও এবার বিজেপিতেই ভরসা খুঁজবে—এমন দাবির পাশাপাশি শুনতে হচ্ছে ‘দিদির ফের ক্ষমতায় আসা শুধু ঘোষণার অপেক্ষা মাত্র’!
পশ্চিমবঙ্গের ‘সিংহাসনে’ কে বসবেন? কোন দলের নেতাকর্মীরা নৃত্য-বাদ্যে আবির মাখবেন, দেখাবেন বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন? কোন রঙে রঙিন হবে রাজ্যের মুখ ও মানচিত্র?—এত-শত প্রশ্নের সরাসরি জবাব মিলছে না কোথাও।
সব দলের শীর্ষ নেতারা নিজেদের বিজয় ‘সুনিশ্চিত’ বললেও সেগুলোয় সিলমোহর দিচ্ছে না আম-জনতা।
গত ৩০ এপ্রিল বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—পশ্চিমবঙ্গ অপেক্ষায় ফলাফলের, তবে আশাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলই।
এতে বলা হয়, রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপির মতো প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান নিয়ে প্রতিযোগিতায় না নামলেও নিজেদের ফল নিয়ে ‘আশাবাদী’ কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট শিবিরও।
এক ভোটার সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘ছোটবেলায় বামেদের দেখেছি, স্কুল-কলেজ জীবনে তৃণমূলকে দেখলাম। কেন্দ্রে বিজেপিকে দেখছি। আমাদের কাছে বেছে নেওয়ার অপশন (বিকল্প) খুব কম। কী হবে দেখা যাক।’
বয়সে তরুণ অপর এক ভোটারের মন্তব্য: ‘মানুষ এবার ভোট দিয়েছে—তা সে খুশিতে দিক বা ভয়ে। তাছাড়া এখনো পর্যন্ত সেভাবে রাজনৈতিক সংঘাত যে হয়নি, সেটাও বড় কথা। কিন্তু, এবারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।’
‘কে জিতবে কে জানে?’—যোগ করেন তিনি।
এমন বাস্তবতায় গতকাল ২ মে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করে—‘নির্বাচনের ফল প্রকাশ নিয়ে শুরু আগামী সপ্তাহ, সাফল্য পাবে কোন কোন রাশি?’
এতে বলা হয়, ৪ মে সোমবার থেকে যে সপ্তাহ শুরু হবে, সেই সময় থাকবে ‘বুধাদিত্য রাজযোগ’। মেষ রাশিতে সূর্য ও বুধের যুতির ফলে এই শুভ যোগ গঠিত হবে।
এর প্রভাবে আগামী সপ্তাহে বৃশ্চিক ও মকর-সহ ৫ রাশির জাতকরা প্রচুর উন্নতি করবেন বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়। বাকি ৩ রাশি হচ্ছে—বৃষ, কন্যা ও মীন।
তবে বুথফেরত সমীক্ষাকে যারা ভোট-পরবর্তী ‘বিনোদন’ মনে করেন, তাদের বক্তব্য—পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনে কোন ফুলের প্রাধান্য থাকে তা জানতে আজ সোমবার ফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সব খবর পড়তে ক্লিক করুন এখানে।

