Wednesday, April 29, 2026
Homeখেলাচোখের জলে লেখা অনন্য অর্জন

চোখের জলে লেখা অনন্য অর্জন

জাতীয় সংগীত বাজছে। মাঠে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে একদল স্বপ্নচারিণী তরুণী। কারো কারো চোখে জল। সিনিয়র পর্যায়ে এটি কেবল তাদের জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচই নয়, বরং এশিয়ান গেমস বাছাইপর্বের এক ঐতিহাসিক সূচনা। নেত্রকোনার খালিয়াজুরি থেকে উঠে আসা রিমন, ঝিনাইদহের রিয়া কিংবা দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁওয়ের অখ্যাত সব প্রান্তর থেকে আসা আরও কয়েকজন। 

কেউ কি কখনো ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিল, একদিন দেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়াবে? তাও আবার এমন এক খেলায়, বিকেএসপির আঙিনায় পা রাখার আগে যার নামটুকুও ঠিকমতো জানা ছিল না তাদের!

বাংলাদেশ নারী হকি দল এবারই প্রথমবারের মতো পা রেখেছিল এশিয়ান গেমসের বাছাইপর্বের আঙিনায়। বয়সভিত্তিক দলের কিছু অভিজ্ঞতা বাদ দিলে জীবনের প্রথম সিনিয়র আন্তর্জাতিক আসরে নেমেই যেন রূপকথার জন্ম দিল তারা। চাইনিজ তাইপেকে রুখে উজবেকিস্তান আর হংকংকে ধুলোয় লুটিয়ে জায়গা করে নিয়েছে সেমিফাইনালে, সেই সঙ্গে ছিনিয়ে এনেছে এশিয়ান গেমসের পরম আরাধ্য টিকিট। 

তবে এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনের গল্পটা খোদ সাফল্যের চেয়েও ঢের বেশি চমকজাগানিয়া। যে দেশে মেয়েদের কোনো সক্রিয় হকি লিগই নেই, সেখানে ১৬ জনের স্কোয়াডের ১৪ জনই বিকেএসপির ছাত্রী। ২০২০ সালে যারা সপ্তম শ্রেণির আনকোরা বালিকা হিসেবে ভর্তি হয়েছিল, তারা আজ এইচএসসি পরীক্ষার দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘ ছয়টি বছর একই সবুজ মাঠে, একই ছাদের নিচে, একই স্বপ্নের জাদুকরী সুতোয় বাঁধা পড়ে বেড়ে উঠেছে সেদিনের কিশোরীরা। আজ সেই স্বপ্ন বোনার দিন, আজ তাদের বিজয়ের দিন।

এই অদম্য দলটির শেকড় মূলত উত্তরবঙ্গে –দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহীর ধুলোমাখা প্রান্তরে। বাকিদের শেকড় হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ বা নেত্রকোনার মেঠোপথে। তারা বিকেএসপির সবুজ ঘাসে পা রেখেছিল ফুটবল বা ক্রিকেটে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে; হকির নামটা তখনো অনেকের কাছেই এক অচেনা শব্দ। 

কোচ জাহিদ হোসেন রাজুর ভাষায়, এই মেয়েদের অনেকটা পরিকল্পিতভাবেই হকির দিকে আকৃষ্ট করা হয়েছিল, কারণ দেশের সব জায়গায় হকির চর্চা বা সুযোগ নেই। বিকেএসপিতে আবাসিক থেকে এই নিবিড় প্রশিক্ষণের সুযোগটাই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সেই ২০২০ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ ছয় বছরের যূথবদ্ধ জীবন আর অবিরাম ছুটে চলাই আজ তাদের দাঁড় করিয়েছে এই গৌরবময় মোহনায়।

শারিকা সাফা রিমনের গল্পটাই ধরা যাক। নেত্রকোনার খালিয়াজুরির এই চঞ্চল মেয়েটি বিকেএসপিতে এসেছিল ফুটবলের ট্রায়াল দিতে, তবে ফুটবলের সঙ্গে সুযোগ মিলে যায় হকিতেও। সমীকরণটা ছিল সহজ। ফুটবলে প্রতিযোগিতা বেশি, হকিতে উপরে যাওয়ার সম্ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই স্টিক হাতে তুলে নেওয়া। কিন্তু কে জানত, খেলতে খেলতেই এই অচেনা খেলাটাই একদিন তার নাড়ির টান হয়ে উঠবে! 

পাঁচ ভাইবোনের সংসারে সবার ছোট রিমন। বড় বোন মামনি আক্তার নিজে কোনো খেলা না খেললেও, খেলার প্রতি তার ছিল তীব্র আবেগ; মূলত তিনিই রিমনের হাত ধরেছিলেন এই কণ্টকাকীর্ণ পথে। ‘আগে কখনো হকি দেখিওনি, খেলিওনি’, রিমনের সহজ স্বীকারোক্তি, ‘কিন্তু এখন মাঠে নামলে মনে হয়, এই খেলাটার জন্যই তো আমার জন্ম!’

রিমনের গল্পের সমান্তরালেই হাঁটে ঝিনাইদহের আইরিন আক্তার রিয়ার জীবনসংগ্রাম। পরিবারের অভাব-অনটনের জাঁতাকলে পড়ে একসময় মনে হয়েছিল, খেলাধুলা করে কী হবে, তার চেয়ে বিয়ে হয়ে যাওয়াই তো সমাজের চিরায়ত নিয়ম! কিন্তু রিয়া দমে যায়নি, মাঠ সে ছাড়েনি। আর সেই রিয়াই এই টুর্নামেন্টে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে হয়েছে ম্যাচসেরা। শিষ্যকে নিয়ে কোচ রাজুর কণ্ঠে তখন অবিমিশ্র গর্বের স্ফুরণ, ‘ওর পরিবার যখন ওকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইল, ঠিক তখনই মেয়েটা প্রমাণ করে দিল সে কতটা পারে।’ 

কেবল রিয়া নয়, দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ মুখ তন্নি খাতুন, যে এখনো নবম শ্রেণির গণ্ডিতে, সেও গত ম্যাচে ম্যাচসেরার মুকুট পরেছে। কোচ তার মেয়েদের চোখে একটিই অলঙ্ঘনীয় স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন; আগামী চার-পাঁচ বছর কোনো বিয়ের পিঁড়ি নয়, পড়াশোনা শেষ করে লাল-সবুজ পতাকার হয়ে লড়তে হবে।

এখানটায় একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঁকি দেয়, যে দেশে ক্রিকেট বা ফুটবলে যশ, খ্যাতি আর অর্থের ঝনঝনানি, সেখানে হকির মতো এমন আড়ালে থাকা এক খেলায় ক্যারিয়ার গড়ার ঝুঁকি কেন নেবে একজন নারী? রিমনের উত্তরটা ভীষণ সহজ, অথচ গভীর জীবনবোধে সিক্ত, ‘আমি এখন হকিকে আপন করে নিয়েছি, খেলাটা ভালোবাসি। কোনো কিছু মন থেকে ধারণ করলে, তাতে সাফল্য আসতে বাধ্য।’ 

অবশ্য কোচ রাজু বাস্তবতার আরেক পিঠও তুলে ধরেন। এখন জাতীয় দলে সুযোগ পেলে মাসে লাখ টাকার বেতন মেলে। নতুন সরকারের এই উদ্যোগ তাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এই আর্থিক নিরাপত্তা মেয়েদের এবং তাদের পরিবারের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগে যেসব অভাবী পরিবার কন্যাকে খেলাধুলার আঙিনা থেকে দূরে সরিয়ে নিত, তাদের চোখেও এখন পরিবর্তনের নতুন ছটা।

এই সাফল্যের অন্যতম রূপকার কোচ রাজু, যিনি ২০২০ সাল থেকে বিকেএসপির হকি বিভাগের প্রধান। মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো কোচ না থাকায় একাই দুই দলের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তবে মেয়েদের নিয়ে কাজ করায় তার কোনো ক্লান্তি নেই, বরং আছে বিশুদ্ধ আনন্দ, ‘ছেলেরা অনেক সময় শেষ মুহূর্তে এসে হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু মেয়েরা শেষ কোয়ার্টারে এসে বুক চিতিয়ে লড়াই করে, আবেগ নিংড়ে দিয়ে অসাধ্য সাধন করে।’ 

২০১২ সালে ছেলেদের দল নিয়ে ইন্দোনেশিয়া সফর করা এই কোচের এশীয় হকির মান নিয়ে বিস্তর ধারণা রয়েছে। এরপর জুনিয়র পর্যায়ে চাইনিজ তাইপে, হংকং ও ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে মেয়েদের অকুতোভয় লড়াই দেখেই তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, সিনিয়র পর্যায়েও এই মেয়েরা বিস্ময় ছড়াবে, ‘ছেলেরা যেখানে খাবি খায়, সেখানে মেয়েরা কী করবে?’ এমন তীর্যক মন্তব্যও একসময় বাতাসে ভেসেছিল বলেন জানান রাজু। মেয়েরা সেই খোঁটার জবাব দিয়েছে মাঠের সবুজ ক্যানভাসে, স্টিকের জাদুতে।

অথচ ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা, এই দলটির তো এই মঞ্চে আসার কথাই ছিল না! যুদ্ধের দামামায় অনূর্ধ্ব-২১ এইচএফ কাপ স্থগিত হয়, তখনই ফেডারেশনের ভাবনায় আসে সিনিয়র দল পাঠানোর। কিন্তু অর্থাভাবে তাও যখন সঙ্গিন, তখন এগিয়ে আসে এনএসসি। তাদের সহায়তায় আচমকা সুযোগ পাওয়া দলটাই আজ এশিয়ান গেমসের টিকিট পকেটে পুরেছে। রিমনের ভাষায়, ‘ফেডারেশনের দৃষ্টিভঙ্গিও এখন অনেকটা বদলে গেছে।’

সেমিফাইনালে ওঠার পর আনন্দে উদ্বেলিত রিমন প্রথম ফোনটা করেছিল তার বাবাকেই। কিন্তু ততক্ষণে নিউজের কল্যাণে বাবার কাছে পৌঁছে গেছে বিজয়ের বার্তা, ‘আমি জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আব্বু তো আমার আগেই জেনে গেছে।’ রিমনের হাসিতে তখন বিশ্বজয়ের আনন্দ।

সাফল্যের সোনালি রোদ এলেও, পেছনের অবকাঠামোর দেয়াল এখনো বেশ নড়বড়ে। এই দেশে মেয়েদের কোনো নিয়মিত হকি লিগ নেই। ব্র্যাক ব্যাংক গত বছর থেকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে, একটি ডেভেলপমেন্ট কাপও আয়োজিত হয় বটে, কিন্তু নিয়মিত প্রতিযোগিতার বড্ড অভাব। কোচ রাজুর মতে, কেবল নিজেদের মধ্যে অনুশীলন করে প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়, ‘প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের উত্তাপেই কেবল আসল খেলাটা শেখা যায়।’

তার দু’চোখে এখন একটিই স্বপ্ন, ভারত বা মালয়েশিয়ার মতো আমাদের দেশেও ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ হোক। গোটা দেশে নারী হকি খেলোয়াড়ের সংখ্যা হয়তো সাকুল্যে তিন-চারশো। এই ক্ষুদ্র এক জলাশয় থেকে উঠে এসে মেয়েরা যা করে দেখিয়েছে, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য এক রূপকথা। তবে এই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এবার রাষ্ট্রকেও স্বপ্ন দেখতে হবে, একটি পূর্ণাঙ্গ লিগের, উন্নত অবকাঠামোর এবং এই মেয়েগুলোর একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের।

সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত লিগ আলোর মুখ দেখবে কি? মেয়েদের এমন অনেক সাফল্য মিলিয়ে গেছে নির্মম বাস্তবতায়, সঠিক পরিচর্যার অভাবে। এশিয়ান গেমসের মহাযুদ্ধে নামার আগে কোচের মতো রিমনেরও একই চাওয়া, ‘দেশে যেন আমাদের জন্য একটি ঘরোয়া লিগ চালু হয়।’

এই মেয়েদের বুকে আছে সব বাধা পেরোনোর দুর্জয় সাহস, আর তা থাকবেও চিরকাল। কারণ জাতীয় সংগীত বাজার সময় যে চোখে জল আসে, সেটা দুর্বলতার নয়, প্রতিজ্ঞার।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments