Thursday, July 23, 2026
Homeঅপরাধবাংলাদেশে নির্মিত হচ্ছে প্রথম সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ

বাংলাদেশে নির্মিত হচ্ছে প্রথম সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ

নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে বাংলাদেশ তাদের প্রথম সমুদ্রবিজ্ঞান (ওশেনোগ্রাফিক) গবেষণা জাহাজ নির্মাণ করছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে জাহাজটি প্রস্তুত হলে দেশের সামুদ্রিক বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনার সুযোগ পাবেন।

তারা আরও বলছেন, ৩২ মিটার দীর্ঘ, ৮ মিটার প্রস্থ (বিম) এবং ৪ মিটার ড্রাফটবিশিষ্ট জাহাজটির নকশা করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিল মেরিন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও চীন থেকে এর বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে।

জাহাজটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৪ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে পারবে, বলছেন তারা।

জানা গেছে, এতে থাকবে অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার ও উচ্চপ্রযুক্তির সেন্সর, যা ব্যবহার করে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিওআরআই) বিজ্ঞানীরা গভীর সমুদ্রের খনিজসম্পদ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন।

গত ১৬ জুন খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে উপকূলীয় তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত ছোট মাছ ধরার নৌকার পরিবর্তে ভবিষ্যতে এই গবেষণা জাহাজ ব্যবহার করা হবে।

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কমোডর শেখ শহীদ আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির গভীর সমুদ্রের পরিবেশ ও সম্পদ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা তাদের নেই।

তিনি বলেন, ‘সমুদ্র গবেষণায় আমরা এতটাই পিছিয়ে যে, মানুষ এখন নিজেদের সমুদ্রের চেয়ে মঙ্গল গ্রহ সম্পর্কে বেশি জানে।’

তিনি বলেন, ‘নতুন গবেষণা জাহাজটি সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। উন্নত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত এ জাহাজ গবেষকদের উপকূলীয় পর্যবেক্ষণের গণ্ডি পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে গবেষণার সুযোগ দেবে।’

এদিকে, ২০১২ ও ২০১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি বিরোধে জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সামুদ্রিক এলাকায় সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত করে। এই সামুদ্রিক এলাকার আয়তন দেশের স্থলভাগের প্রায় সমান।

২০১৬ সালে কক্সবাজারের রামুতে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলেও গবেষণা অবকাঠামোর অভাবে দেশটি এখনো ব্লু ইকোনমির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি।

কমডোর শেখ শাহীদ আহমেদ বলেন, স্থলভিত্তিক সম্পদ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদের গুরুত্ব আরও বাড়বে। সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি। বর্তমানে মাছের মজুদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই আহরণ চলছে।

নতুন জাহাজ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা বঙ্গোপসাগরে মাছের অবস্থান ও বিস্তৃতি শনাক্ত করতে পারবেন। পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, শৈবাল এবং অন্যান্য সামুদ্রিক সম্পদ নিয়েও গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে, বলেন তিনি।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটিতে সংযোজিত ভাইব্রো কোরার, বক্স কোরার অ্যাকুস্টিক ডপলার কারেন্ট প্রোফাইলার (এডিসিপি) সমুদ্রতলের মাটির নমুনা সংগ্রহ এবং সমুদ্রস্রোত পরিমাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

বায়োলজিক্যাল, কেমিক্যাল এবং এনভায়রনমেন্টাল ওশানোগ্রাফি গবেষণার জন্য ল্যাব সুবিধা এবং বিভিন্ন সায়েন্টিফিক সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ইকুইপমেন্টস সংযুক্ত থাকবে বিধায় সমূদ্র গবেষণা ও হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রম আরও বেগবান হবে, বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

জাহাজটিতে ২৩ জন বিজ্ঞানী ও ক্রু সদস্য থাকার ব্যবস্থা থাকবে। তারা টানা আট থেকে ১০ দিনব্যাপী দিন-রাত গবেষণা অভিযান পরিচালনা করতে পারবেন।

এতে তিনটি বিশেষায়িত পরীক্ষাগারও থাকবে। এগুলো হলো একটি ওয়েট ল্যাব, একটি ড্রাই ল্যাব এবং একটি ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাব। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে জাহাজ থেকেই গবেষণার তথ্য সরাসরি স্থলভিত্তিক সমুদ্রবিজ্ঞান তথ্যকেন্দ্রে পাঠানো যাবে।

তবে কমোডর শহীদ বলেন, জাহাজটির আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় এটি সব ধরনের আবহাওয়ায় পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। ফলে বছরে মাত্র তিন থেকে চার মাস গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে।

১৬০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আওতায় গবেষণা জাহাজের পাশাপাশি দুটি উচ্চগতির কেবিন বোট, ৩৬ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার প্রশস্ত একটি পন্টুন, ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি জেটি এবং একটি গ্যাংওয়ে নির্মাণ করা হবে। এসব স্থাপনা কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় স্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত ৮০০টির বেশি নতুন জাহাজ নির্মাণ এবং আড়াই হাজারের বেশি জাহাজ মেরামত করেছে।

তারপরও খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মাকসুদ আলম এই প্রকল্পকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এর আগে গবেষণা জাহাজ নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে মৎস্য গবেষণা জাহাজও রয়েছে। তবে সেগুলো মালয়েশিয়াসহ বিদেশে নির্মিত হয়েছিল।’

আলম বলেন, দেশে নির্মিত এই জাহাজ সামুদ্রিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক পরিবেশ ও সম্পদ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে এটি বড় ভূমিকা রাখবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments