Wednesday, July 22, 2026
Homeবাজেটের কর কাঠামো কতটা ন্যায্য হলো

বাজেটের কর কাঠামো কতটা ন্যায্য হলো

বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুতর একটি সংকট হলো—অর্থনীতির আকারের তুলনায় কর আহরণের হার বিশ্বের সবচেয়ে কমগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন ও সুদানের সামান্য ওপরে।

ওইসিডির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোতে যা ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং উন্নত দেশে ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ থাকে।

এই কম কর আহরণের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য নাগরিক সেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অর্থ সংকুলান কঠিন হয়ে যায়।

ফলে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে বাংলাদেশকে কর আহরণ বাড়াতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

প্রশ্ন হলো—এই কর আহরণ কীভাবে বাড়ানো হবে?

দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট ও শুল্কের মতো পরোক্ষ করের মাধ্যমে, নাকি ধনী ও সামর্থ্যবানদের আয় ও মুনাফার মতো প্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে?

অথবা ধনী ও সামর্থ্যবানদের কর ফাঁকি দূর করে, নাকি বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকেই আরও বেশি কর আহরণ করে?

এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করবে বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়বে না কমবে।

কর আদায় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ আয় করের বদলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পরোক্ষ কর আদায়ের ওপর বেশি নির্ভর বা কর ফাঁকি দেওয়া ধনী ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বদলে নিম্ন আয়ের করদাতাদের ওপর বেশি নির্ভর করা হলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আরও বাড়বে।

বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিল, বাংলাদেশের রাজস্ব সংকট মূলত কোনো কারিগরি সমস্যা নয়, বরং এটি বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতির ফল।

বিএনপি এই কাঠামো ভেঙে আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাকে ন্যায্য, সর্বজনীন ও প্রযুক্তিনির্ভর করার মাধ্যমে রাজস্ব ভিত্তি সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

দলটি উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সম্পত্তির মালিকদের করজালের আওতায় আনা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। (বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার, পৃষ্ঠা ৩৭)

চলুন দেখা যাক, এবারের বাজেটের কর কাঠামোতে সেই প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করা হলো।

বাজেটে চাল, গম, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, আদাসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে কর কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের ওপর উৎসে করের হার বিদ্যমান ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর ফলে পণ্য আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যায়ে করের চাপ কমবে। এর প্রভাব যদি শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পড়ে, তাহলে তা মূল্যস্ফীতি হ্রাসের ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণ মানুষের ওপর থেকে পরোক্ষ করের চাপ কমানোর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে দিনশেষে সাধারণ মানুষের ঘাড় থেকে করের সর্বমোট বোঝা কমছে না বাড়ছে, তা বোঝার জন্য কর কাঠামোর দিকে তাকানোর দরকার।

কর কাঠামো বলতে বুঝতে হবে প্রত্যক্ষ কর ও পরোক্ষ করের অনুপাত।

বাজেটের অর্থ কার কাছ থেকে আদায় করে, কার কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটা বোঝার জন্য করের এই অনুপাতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্যক্ষ কর হলো—সামর্থ্যবানদের আয় ও মুনাফা থেকে প্রাপ্ত কর। আর পরোক্ষ কর হলো—ভ্যাট ও শুল্ক বাবদ প্রাপ্ত কর, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার কাছ থেকে আদায় করা হয়।

বেশিরভাগ কর যদি দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা হয়, তাহলে সেটা বৈষম্য বাড়ায়।

বৈষম্য কমাতে হলে প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হয়। অর্থাৎ ধনীদের কাছ থেকে কর আদায় বাড়াতে হবে।

দেখতে হবে, বিভিন্ন ধরনের কর ছাড়ের ফলাফল কর কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনছে কি না।

যদি বরাবরের মতোই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পরোক্ষ কর বেশি আদায় করা হয়, তাহলে এসব কর ছাড় কোন কোন ক্ষেত্রে স্বস্তি দিলেও দিনশেষে করের মূল বোঝাটা সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।

বিএনপি সরকার ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট অনুসারে, এনবিআরের মাধ্যমে কর আহরণ করা হবে মোট ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ধনী ও সামর্থ্যবানদের আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর প্রত্যক্ষ কর আদায় করা হবে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আমদানি শুল্ক ইত্যাদি খাতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পরোক্ষ কর আদায় করা হবে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। (বাজেট ২০২৬-২৭, রাজস্ব প্রাপ্তির বিবরণ)

অর্থাৎ এনবিআরের মাধ্যমে যত কর আদায় করা হবে, তার ৩৬ দশমিক ৪০ হলো—ধনী ও সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে আদায় করা প্রত্যক্ষ কর। আর ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ হলো—সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা পরোক্ষ কর।

বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের হার ছিল যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ২০ ও ৬৩ দশমিক ৮০ শতাংশ।

আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের হার ছিল যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৪৪ ও ৬৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

এর মানে বরাবরের মতো এবারের বাজেটেও ধনীদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করের বদলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট ও শুল্ক বাবদ আদায় করা পরোক্ষ করের ওপর অধিক নির্ভরশীলতা দেখা যাচ্ছে।

অর্থাৎ এবারের বাজেটে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিশেষত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও অর্থ আয়ের ক্ষেত্রে অর্থাৎ কর কাঠামোর বৈষম্য নিরসনের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায়নি।

এমনকি প্রত্যক্ষ কর আহরণ বৃদ্ধির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেও ধনী ও সামর্থ্যবানদের কর ফাঁকি রোধ ও কর জাল বিস্তারের বদলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই বেশি চাপ তৈরির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

উদ্যোগগুলো এমন যে, তাতে ধনীদের তুলনায় নিম্ন আয় ও মধ্যবিত্তের ওপর বেশি চাপ তৈরি হবে।

যেমন: বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও ৫ শতাংশের প্রাথমিক কর ধাপ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ১০ শতাংশ করের প্রাথমিক ধাপ ঠিক করা হয়েছে।

বাজেটের এ প্রস্তাবে বর্তমানে যারা কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর করের চাপ আরও বাড়বে। শুধু তাই না, যাদের আয় তুলনামূলক কম তাদের কর বৃদ্ধির হার যাদের আয় বেশি তাদের তুলনায় বেশি।

যেমন: সমকালে প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, যার মাসিক আয় ৭৪ হাজার টাকা, তার কর দায় বাড়বে ৪৯ শতাংশ।

অন্যদিকে যার মাসিক আয় আড়াই লাখ টাকা বা তার বেশি, তাদের কর দায় বাড়বে সাড়ে ১০ শতাংশ।

বিনিয়োগ করলে ব্যক্তি করদাতারা যে রেয়াত পান, তাও কমানো হয়েছে। এটিও বিদ্যমান করদাতাদের করের চাপ বাড়াবে।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবন বিমার প্রিমিয়ামসহ ৯টি খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে
করদাতারা কর রেয়াত পান। এ ক্ষেত্রে মোট আয়ের ৩ শতাংশ, অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি কম, সেটি কর রেয়াত হিসেবে বিবেচিত হয়।

নতুন প্রস্তাবে অনুমোদিত বিনিয়োগের সীমা ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ বিনিয়োগসীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে প্রতি ১ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা আগের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার টাকা কম কর ছাড় পাবেন।

মধ্যবিত্ত পরিবার ও পেনশনভোগীরা সংসার খরচের জন্য যে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করেন, তার মুনাফার ওপরও করের হার বাড়িয়েছে সরকার।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ থাকলে মুনাফার ওপর ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটা হয়।

১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এ হার ১০ শতাংশ।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই উৎসে করই চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য হয় এবং পরবর্তীতে এ আয়ের ওপর আর কোনো কর দিতে হয় না।

নতুন বাজেটে এই সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে যেকোনো ধরনের
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর কেটে রাখা হবে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আর চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং করদাতার মোট আয়ের সঙ্গে এই আয় যোগ হয়ে নির্ধারিত কর স্ল্যাব অনুযায়ী কর পরিশোধ করতে হবে।

উৎসে কাটা করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা হবে, যা আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সমন্বয় করা যাবে। এর ফলে ৫-৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রধারী মধ্যবিত্ত পরিবার ও পেনশনভোগীদের মুনাফার টাকার পরিমাণ কমে যাবে।

কাজেই দেখা যাচ্ছে, বিএনপি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও সম্পত্তির মালিকদের নতুন করে করজালের আওতায় আনার বদলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই করের চাপ বাড়িয়েছে।

আবার করজাল বিস্তারের জন্য যেভাবে খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর হাজারে ২ টাকা হারে অগ্রিম কর ধার্য করেছে, সেটাও দিন শেষে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে। এভাবে কর আদায় বিদ্যমান তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের জন্য অনুকূল পদক্ষেপ নয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে সেই সরকারের পতনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে দেশের মানুষ বৈষম্য হ্রাসের পদক্ষেপ আশা করে।

কাজেই বিএনপি সরকারের দিক থেকে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না, যা এই বৈষম্য আরও বৃদ্ধি করে।

ফলে সরকারকে ভ্যাট এবং শুল্কের মতো পরোক্ষ কর ও বিদ্যমান নির্দিষ্ট আয়ের করদাতাদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় বৃদ্ধির ‘সহজ রাস্তা’ থেকে সরে আসতে হবে। এর পরিবর্তে, কর ফাঁকি দেওয়া ও কর জালের আওতার বাইরে থাকা ধনী এবং সামর্থ্যবানদের আয় ও সম্পদ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়াতে হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments